বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে যারা ‘গুপ্ত’ বেশ ধারণ করেছিল, তাদের আড়ালেই ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচার নতুন করে অরাজকতা সৃষ্টি ও পুনর্বাসনের চেষ্টা চালাচ্ছে কি না—এমন গভীর সংশয় ও প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
শনিবার বিকেলে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেন।
একটি বিশেষ বিরোধী দলের নাম উল্লেখ না করে ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, স্বৈরাচারের শাসনামলে একটি দল গোপনে কাজ করেছে, যা তাদের দলীয় ব্যক্তিরাই প্রকাশ করেছেন। এখন সেই একই পক্ষ ভিন্ন রাজনৈতিক ছদ্মবেশে দেশজুড়ে অস্থিরতা ছড়ানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেন, “স্বৈরাচারের সময় যারা ‘গুপ্ত’ অবস্থানে ছিল, তাদের মধ্যে আশ্রয় নিয়েই পরাজিত স্বৈরাচার নতুন করে অরাজকতা উসকে দিচ্ছে কি না, তা আজ খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।”
অতীত ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপি প্রধান অভিযোগ করেন, ১৯৭১ সাল থেকে শুরু করে ১৯৮৬, ১৯৯৬ এবং বিগত এক দশকেও এই দুই শক্তি একে অপরকে আড়াল ও সুরক্ষা দিয়ে এসেছে।
গণতান্ত্রিক ধারা ও নীতি-নৈতিকতা বজায় রাখতে সরকার সর্বোচ্চ সচেষ্ট উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান, অন্তর্বর্তীকালীন ও স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল সংকটের বোঝা কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছে বিএনপি সরকার। তবে সমস্যাকে পুঁজি করে কেউ সীমা লঙ্ঘন করলে তা বরদাশত করা হবে না।
বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির যেকোনো পাঁয়তারা আইনগতভাবে কঠোর হস্তে দমন করার হুঁশিয়ারিও দিয়ে তিনি বলেন, একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে আমাদের পরিষ্কার বার্তা—প্রত্যেক দল ও ব্যক্তির নিজস্ব সীমার মধ্যে অবস্থান করা উচিত। দেশের আইনশৃঙ্খলা বিনষ্টের চেষ্টা করা হলে সংবিধিবদ্ধ আইন অনুযায়ী কঠোর পদক্ষেপ নেবে সরকার।
বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা। বর্তমান জ্বালানি সংকটকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রধানমন্ত্রী ভুক্তভোগী জনগণ ও শিল্পমালিকদের প্রতি সমবেদনা জানান। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামলাতে সরকার বাধ্য হয়ে কিছুটা দাম সমন্বয় করলেও সাধারণ মানুষের স্বস্তি নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে।
ইতিমধ্যে সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, সাধারণ মানুষের ওপর বাজেটের বোঝা কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় ৬০টি পণ্যে কর বাড়ানো হয়নি, বরং কিছু পণ্যে ছাড় দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’, ধর্মীয় গুরুদের ভাতা এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
বিএনপির ৪৮ বছরের রাজনৈতিক অবদান তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে দেশে বহুদলীয় ও সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় দেশে এবার ‘টেকসই গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের মূল লক্ষ্য, যেখানে বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পূর্ণাঙ্গভাবে সুরক্ষিত থাকবে।
বক্তব্যের শেষভাগে দলীয় পদ-পদবির মোহ থেকে বেরিয়ে এসে নেতা-কর্মীদের ‘সাচ্চা জাতীয়তাবাদী কর্মী’ হিসেবে দেশের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। একই সাথে পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সফল করতে সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে দলের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক শীর্ষনেতাদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। সভায় মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্য, উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।














































