নিউজ ডেস্ক: বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম প্রতিবাদকারী শহীদ মৌলভী সৈয়দের বড় ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. আলী আশরাফকে গার্ড অব অনার না দেয়া এবং বাঁশখালীতে এমপি মোস্তাফিজ কর্তৃক মৌলভী সৈয়দের পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকি ও বাঁশখালীতে মুক্তিযোদ্ধাদের মানববন্ধনে হামলার প্রতিবাদে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান কর্মসূচিতে হামলা চালিয়ে পণ্ড করে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা।

হামলার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা বাঁশখালীর সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমানের অনুসারীদের দায়ী করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের উপর সন্ত্রাসী হামলায় যৌথভাবে নেতৃত্বে দেন সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমানের এপিএস এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান রাসেল ও বাঁশখালী পৌর মেয়র সেলিমুল হক।

সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুর ১২টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব চত্বরে বাঁশখালীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান কর্মসূচিতে সশস্ত্র হামলায় মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিকসহ অন্তত ১৫ জন আহত হন। এসময় লাঠিসোটা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাসহ সাংবাদিকদের বেদম পেটায় এমপির ক্যাডার বাহিনী!

শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচিতে মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিকদের উপর সশস্ত্র হামলায় অভিযুক্ত বাঁশখালী এমপি মোস্তাফিজুর রহমানের এপিএস মোস্তাফিজুর রহমান রাসেল (বামে) ও বাঁশখালী পৌর মেয়র সেলিমুল হক (ডানে)

হামলায় আহতরা হলেন, চট্টগ্রাম মহানগর মুক্তিযোদ্ধা কামান্ডার মোজ্জাফফর আহমদ, বাঁশখালী কমান্ডার আবুল হাশেম, সাতকানিয়া কমান্ডার আবু তাহের, মুক্তিযোদ্ধা আজিমুল ইসলাম ভেদু, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার অর্থ আবদুর রাজ্জাক, মৌলভী সৈয়দের ভাতিজা জয়নাল আবেদীন, জহির উদ্দীর মোা. বাবর, ইমরানুল ইসলাম তুহিন, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবু সাদাত মো. সাইয়েম (গুরুতর আহত), মোব্বাশের হোসেন সোহান, কামরুল হুদা পাভেল।

এছাড়া পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের উপর সন্ত্রাসী হামলা আহত হয়েছেন চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও চ্যানেল আই চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রধান চৌধুরী ফরিদ, ক্যামেরা পার্সন নবাব মিয়া, দৈনিক জনকন্ঠের ফটো সাংবাদিক সাইদুল আজাদ, জয় নিউজ এর ফটো সাংবাদিক বাচ্চু বড়ুয়া, নয়া দিগন্তের ফটো সাংবাদিক আকতার হোসেন, পূর্বদেশ এর ফটো সাংবাদিক এম. হায়দার আলী ও দৈনিক সাঙ্গুর ফটো সাংবাদিক মো. জাহাঙ্গীরসহ ১০ থেকে ১২ জন সাংবাদিক।

সাংবাদিকদের ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, কর্মসূচি শুরুর পর সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমানের এপিএস এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান রাসেল ও বাঁশখালী পৌর মেয়র সেলিমুল হকের যৌথ নেতৃত্বে একটি মিছিল অবস্থান কর্মসূচির দিকে এগিয়ে আসছে। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মিছিলের লোকজন লাঠি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান কর্মসূচিতে হামলা চালায়। এতে পণ্ড হয়ে যায় কর্মসূচি।

ঘটনাস্থল থেকে মুক্তিযোদ্ধা আলী আশরাফের ছেলে জহির উদ্দিন বাবর বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার চেয়ে আমার পরিবারের সদস্য জীবন দিয়েছে। আজকে কুলাঙ্গাররা হত্যার উদ্দেশ্যে আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। আমাকে ও বাঁশখালী উপজেলা কমান্ডারসহ অনেককে আহত করেছে।

এই ঘটনায় চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে)’র পক্ষে প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইফতেখার ফয়সাল স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনকারী সাংবাদিকদের ওপর যে হামলার ঘটনা ঘটেছে তা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ও নিন্দনীয়। প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত এ সন্ত্রাসী ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানান তাঁরা।

এছাড়া চট্টগ্রামের সাংবাদিকদের উপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফটোর্জানালিষ্ট এসোসিয়েশন। বাংলাদেশ ফটোজার্নালিষ্ট এসোসিয়েশনের চট্টগ্রামের সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা মনজুরুল আলম মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান।

অন্যদিকে চট্টগ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর হামলার প্রতিবাদে আগামীকাল (মঙ্গলবার) সকাল ১১ টায় রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ডাক দিয়েছে। এছাড়া হামলার প্রতিবাদে মঙ্গলবার চট্টগ্রামে জনতার সমাবেশের ডাক দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধারা।

শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচিতে মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিকদের উপর সশস্ত্র হামলার দৃশ্য।

এদিকে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলার ঘটনায় বাঁশখালী (চট্টগ্রাম-১৬) আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমানের এপিএস (ব্যক্তিগত সহকারী) এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান রাসেলসহ চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসিন।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি বাঁশখালীতে মারা যান ডা. আলী আশরাফ। তিনি ছিলেন শেখেরখীল ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার এবং বাঁশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম প্রতিবাদকারী শহীদ মৌলভী সৈয়দের বড় ভাই। মৃত্যুকালে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত রাষ্ট্রীয় সম্মান পাননি বাঁশখালী উপজেলার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা ডা. আলী আশরাফ।

গার্ড অব অনার ছাড়াই সোমবার (২৭ জুলাই) সকালে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শেখেরখীল এলাকায় নিজ বাড়ির কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। মৌলভী সৈয়দের পরিবার এ জন্য বাঁশখালীর সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমানকে দায়ী করেন। তাদের দাবি, সংসদ সদস্য নিষেধ করায় উপজেলা প্রশাসন সম্মাননা দেয়নি।

বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাঁশখালীতে এক অনুষ্ঠানে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাঁশখালীতে কোনও মুক্তিযোদ্ধা নেই।’ তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড, চট্টগ্রাম সোমবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে মানববন্ধনের আয়োজন করে।

শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচিতে মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিকদের উপর সশস্ত্র হামলার সময় এমপির ব্যক্তিগত সহকারী মোস্তাফিজুর রহমান রাসেল (লাল বৃত্ত), জিল্লুল করিম শরিফী ও পৌর কাউন্সিলর দিলীপ চক্রবর্তী।