নিউজ ডেস্ক: গত ডিসেম্বরে চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনাভাইরাস বিশ্বকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে। এখন পর্যন্ত ভাইরাসটিতে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দুই কোটি। মৃতের সংখ্যা সোয়া ৭ লাখ। আর সুস্থ রোগীর সংখ্যা সোয়া ১ কোটি।

এদিকে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। আর এতে প্রথম মৃত্যু হয় ১৮ মার্চ। এর পর পর্যায়ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। তবে দীর্ঘদিন করোনামুক্ত ছিল নাটোর জেলা। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। গত ২৮ এপ্রিল নাটোরের তিন উপজেলায় একসাথে হানা দিয়েছে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস। সেদিন প্রথমবারের মতো একসাথে ৮ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়।

এর পর থেকে নিয়মিতভাবে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আক্রান্ত হন পুলিশ, ডাক্তার, ব্যবসায়ী, নারী-পুরুষ, শিশুসহ ৬২৭ নিরীহ মানুষ। করোনা আক্রান্তে প্রায় রেকর্ড ভঙ্গ করে চলেছে নাটোর জেলা। এর মধ্যে ৭ আগস্ট নাটোরে ডাক্তার, পুলিশ, সাংবাদিকসহ একদিনে ৮৬ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এতে মহামারী করোনাভাইরাসের নতুন ‌‘হট স্পটে’ পরিনত হয়েছে নাটোর।

এই জেলায় করোনা আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, নাটোরের জেলা প্রশাসক মো. শাহরিয়াজ, সিভিল সার্জন ডা. কাজী মিজানুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আবুল হাসনাত, গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তমাল হোসেন, বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান ডা. সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী, বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ তোহিদুল ইসলাম, নাটোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহাঙ্গীর আলম, গুরুদাসপুরের সাংবাদিক নেতা আলী আক্কাস, নাটোরের সাংবাদিক নেতা নাবীউর রহমান পিপলু, জালাল উদ্দীন, বড়াইগ্রামের সাংবাদিক জাহিদ হাসান প্রমুখ। এর মধ্যে মারা গেছেন একজন জন করোনা রোগী। এছাড়া জেলার বাহিরে বসবাসকারী বেশ কয়েকজন করোনা রোগী মারা গেছেন।

এদিকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও প্রাণহানির সংখ্যা বাড়লেও এখন নাটোরে কেউ স্বাস্থ্যবিধি মানতে চাইছেন না। হাট-বাজার থেকে শুরু করে বিনোদনকেন্দ্র কোথায়ও স্বাস্থ্যবিধি মানার তাগিদ নেই। এছাড়া গণপরিবহনেও স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। এতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে।

গত ঈদে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েই প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামে এসেছিলেন হাজারও কর্মজীবী মানুষ। ছুটি শেষে আবারও তারা কর্মস্থল ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। এ কারণে নাটোর কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ডসহ বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের বেশ কয়েকটি বাসস্ট্যান্ডে মানুষের চাপ রেড়েছে। তবে অধিকাংশ পরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখা যায়নি।

এত কিছুর পরেও প্রশাসনও নীরব, হয় তো করোনাভাইরাস নিয়ে ব্যবস্থা নিতে নিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে তারা। এর আগে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন যেভাবে উদ্যাগ নিয়েছিল। সেই অবস্থার এখন আর নেই নাটোরে। যেন সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

এদিকে বন্যায় নাকাল নাটোরের একটি অংশ। তার মধ্যে জেলাবাসীর জন্য আরেকটি দুঃসংবাদ এসেছে। তা হলো, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নাটোরের করোনা পরীক্ষার জন্য প্রেরিত নমুনা গ্রহণ করছেন না। তারা সেগুলো পরীক্ষা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছেন। অথচ নাটোরে পিসিআর ল্যাব থাকলে নাটোরবাসীকে এ ধরণের ভোগান্তি পোহাতে হতো না।

জানা গেছে, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথম থেকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থাপিত পিসিআর ল্যাবে রাজশাহী বিভাগের পরীক্ষা শুরু করা হয়। পরবর্তীতে বগুড়া,সিরাজগঞ্জ ও পাবনাতে পিসিআর ল্যাব স্থাপন করা হয়। কিন্তু নাটোরে সংগৃহীত সকল নমুনা রাজশাহীতে পাঠানো হতো। তবে তাদের সামর্থের চেয়ে বেশী নমুনা সেখানে জমা হচ্ছিল। তাই কখনো কখনো রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ সেগুলো ঢাকায় প্রেরণ করতেন। সম্প্রতি নাটোর থেকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ ল্যাবে নমুনা প্রেরণ করলে তারা সেগুলো গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়।

বিষয়টি নিশ্চিত করে নাটোরের সিভিল সার্জন ডাঃ মিজানুর রহমান জানান, এই অবস্থায় নাটোরে একটি পিসিআর ল্যাব স্থাপনের জন্য আবেদন করেছিলাম। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সে বিষয়ে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।

তিনি স্বীকার করেন, করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষায় দেরী হওয়ায় করোনা ছড়িয়ে পড়ার একটি অন্যতম কারণ। সে জন্য নাটোরে একটি পিসিআর ল্যাব স্থাপন করা হলে অধিক সংখ্যক নমুনা পরীক্ষা ও চিকিৎসা দেওয়া সহজ হতো বলে জানান তিনি।