নিউজ ডেস্ক: দিনাজপুরের ফুলবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে শালবাগানে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় অজ্ঞাত লাশটির পরিচয় মিলেছে। তার নাম রুখিয়া রাউৎ। সে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর (আদিবাসী) এক শিক্ষার্থী।

রংপুর কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অনার্স ইতিহাস বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী রুখিয়া রাউৎ। তার বাড়ি রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের মিশনপাড়ায়। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পরিবারের দিনেশ রাউৎ এর মেয়ে।

দিনেশ রাউৎ জানান, আব্দুল গফুরের ছেলে আনিছুল প্রায় সময় রুখিয়াকে ত্যক্ত-বিরক্ত করত। হোস্টেল থেকে বাড়িতে আসলে সে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করা শুরু করে। একপর্যায়ে সে প্রেমের প্রস্তাব দেয় আমার মেয়েকে। গত সোমবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে রুখিয়া তার ডায়েরিতে লিখে গেছে ‘আত্মহত্যা করতে গিয়ে কোনোভাবে বেঁচে গেলাম। আজ ৫/১০/২০২০ আমাকে আনিছুল দূরে কোথাও ডেকেছে। যেখানে ও নিজের হাতে আমাকে হত্যা করবে। এ কথা ও নিজে বলেছে যে ও আমাকে নিজের হাতে হত্যা করবে। আমার সবকিছুর জন্য আনিছুল দায়ী। বাড়ি থেকে যাওয়ার কোনো একসময় রুখিয়া ডায়েরিতে এসব লিখে যায়। আজ সকালে পড়ার টেবিল থেকে রুখিয়ার ডায়েরি উদ্ধার করে এসব তথ্য পাওয়া যায়।

তাকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে নির্দয়ভাবে হত্যার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বুধবার (৭ অক্টোবর) তাদের গ্রেফতার করা হয়। এর আগে গত মঙ্গলবার ভোরে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে শালবাগানে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় অজ্ঞাত লাশটির উদ্ধার করেছে পুলিশ।

হত্যার মুল পরিকল্পনাকারী হিসেবে আনিছুর রহমান (৩০), অটোচালক রাজ মিয়া (২৮) ও আশিকুজ্জামানকে (২৭) আজ বুধবার (৭ অক্টোবর) ভোরে নিজ নিজ বাড়ি থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়ার জন্য তাদের দিনাজপুর আদালতে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় তিনজনকে আসামি করে পার্বতীপুর থানায় হত্যা মামলা করা হয়েছে।

নিহত রুখিয়া রাউৎ এর পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রংপুরে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হন রুখিয়া। বান্ধবীদের সঙ্গে একরাত থেকে পরের দিন তার ফিরে আসার কথা ছিল। শেষবার ফোনে মা সুমতিকে সে বলে যায়, মা রংপুর যাচ্ছি। চিন্তা করিস না। সকালে আবার ফিরে আসব। এরপর থেকে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ওই দিন সে আর বাড়িতে ফিরে না আসলে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের লোকজন।

অবশেষে পরের দিন মঙ্গলবার ভোরের দিকে বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়া ইউনিয়নের ঘুনুরঘাট এলাকার পার্শ্ববর্তী পার্বতীপুর উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের পাঁচপুকুরিয়ার শালবাগান থেকে অজ্ঞাত একটি লাশটি উদ্ধার করে মধ্যপাড়া পুলিশ ফাঁড়ি। উদ্ধারের সময় ওড়না দিয়ে তার হাত-পা গলায় সঙ্গে বাঁধা ছিল। পরনে ছিল সালোয়ার-কামিজ। দাঁতগুলো ভেঙে দেয় দুর্বৃত্তরা। রক্তাক্ত ও ক্ষত-বিক্ষত ছিল মুখ। দুর্বৃত্তরা নির্দয়ভাবে হত্যার পর অটোচালিত গাড়িতে করে সেখানে লাশটি ফেলে যায়। পরে মধ্যপাড়া পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

এদিকে লাশের পরিচয় জানতে ওই দিন সন্ধ্যায় দিনাজপুর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) একটি তদন্তদল মৃতের হাতের আঙুলের ছাপ নেয়। জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে চেহারার ছবি মিলে যাওয়ায় তার পরিচয় নিশ্চিত হন তারা। পরে জানতে পারেন সে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পরিবারের মেয়ে। বাড়ি বদরগঞ্জে। এতে বদরগঞ্জ থানা পুলিশ সার্বিকভাবে জড়িতদের গ্রেফতারে সহায়তা করেছে।

এ ঘটনার পর দিনাজপুরের ফুলবাড়ী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নির্দেশে পার্বতীপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সোহেল রানার নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। তারা বদরগঞ্জের রামনাথপুর ইউনিয়নের খোর্দবাগবাড় এলাকার মূলহোতা আব্দুল গফুরের ছেলে আনিছুর রহমান (৩০) তার ভগ্নিপতি অটোচালক বাবু মিয়ার ছেলে রাজ মিয়া ও পার্শ্ববর্তী পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের দুর্গাপুর এলাকার জয়নাল আবেদীনের ছেলে আশিকুজ্জামানকে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে পার্বতীপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সোহেল রানা বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। আলামত হিসেবে বেশকিছু জিনিসপত্র তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে নিহতের মোবাইল ফোনটি পাশের একটি পুকুর ফেলে দেওয়ায় সেটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।