বুধবার (১১ ডিসেম্বর) নাটোরের লালপুর উপজেলার গোপালপুর ডিগ্রি কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সাবেক সহকারী অধ্যাপক মো. আব্দুস সাত্তার ওরফে টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ছবি: সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক: নাটোরের লালপুর উপজেলার গোপালপুর ডিগ্রি কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সাবেক সহকারী অধ্যাপক মো. আব্দুস সাত্তার ওরফে টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক শিবির নেতা রাজশাহীর বোয়ালিয়ার মো. আব্দুস সাত্তার ওরফে টিপু রাজাকার ওরফে টিপু সুলতানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

বুধবার (১১ ডিসেম্বর) ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর ছিলেন মোখলেসুর রহমান বাদল। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী গাজী এম এইচ তামিম।

রায় ঘোষণার পর প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদল বলেন, আনীত অভিযোগ প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পেরেছে। এই রায়ে প্রসিকিউশন সন্তুষ্ট। বিজয়ের এই মাসে এ রায় মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধে ভিকটিমদের জন্য একটি স্বস্তি। এ রায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আরো একটি মাইলফলক।

আসামিপক্ষে গাজী এম এইচ তামিম বলেন, এই রায়ে আসামি সংক্ষুব্ধ। তিনি সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।

আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে যে দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো হলো- ১৯৭১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর দুপুর দেড়টা থেকে পরদিন মধ্যরাত পর্যন্ত আসামি আব্দুস সাত্তার ওরফে টিপু সুলতান ওরফে টিপু রাজাকার, স্থানীয় অন্যান্য রাজাকার ও পাকসেনারা বোয়ালিয়া থানার সাহেব বাজারের এক নং গদিতে (বর্তমানে জিরো পয়েন্ট) হামলা চালিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা বাবর মন্ডলকে আটক করেন। পরে তাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শামসুজ্জোহা হলে স্থাপিত সেনা ক্যাম্পে নিয়ে দিনভর নির্যাতন করার পর গুলি করে হত্যা করে মরদেহ মাটিচাপা দেন। ১৯৭১ সালের ২ নভেম্বর রাত প্রায় ২টার দিকে এ আসামি, স্থানীয় রাজাকার ও ৪০ থেকে ৫০ পাকসেনা বোয়ালিয়া থানার তালাইমারী এলাকায় হামলা চালান। এ হামলায় আওয়ামী লীগ নেতা চাঁদ মিয়া, আজহার আলী শেখসহ ১১ জনকে আটক করে নির্যাতন চালান। এসময় তারা তালাইমারী এলাকার ১২ থেকে ১৩টি বাড়ি লুট করেন। পরে ৪ নভেম্বর মধ্যরাতে আটক ১১ জনকে রাবির শহীদ শামসুজ্জোহা হলে স্থাপিত অস্থায়ী ক্যাম্প ও টর্চার সেলে নিয়ে গিয়ে নয়জনকে গুলি করে হত্যা করে মাটিচাপা দেন।

মো. আব্দুস সাত্তার ওরফে টিপু সুলতানের বাড়ি রাজশাহীর বোয়ালিয়ায়। তবে তিনি ১৯৮৪ সালে নাটোরের লালপুর উপজেলার গোপালপুর ডিগ্রি কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। আর ২০১১ সালে অবসরে যান। তবে ১৯৮৪ সালের পর রাজনৈতিক কর্মকান্ডে কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া না গেলেও এই আসামি জামায়াতে ইসলামির সমর্থক হিসেবে স্থানীয়ভাবে পরিচিত বলে জানায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এর আগে টিপু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় টিপু সুলতান জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন, লুটতরাজ, হত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। টিপু সুলতানকে একত্তরের ভূমিকার জন্য রাজশাহীর অনেকে চেনে ‘টিপু রাজাকার’ নামে।

প্রসিকিউশন ও আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে গত ১৭ অক্টোবর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান (সিএভি) রেখেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের পক্ষে এ মামলায় শুনানি করেন মো. মোখলেসুর রহমান বাদল ও জাহিদ ইমাম। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী গাজী এমএইচ তামিম। এর আগে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ২০১৭ সালের ২ মে টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের তদন্ত শুরু করে। তদন্ত শেষে গত বছর ২৭ মার্চ টিপুর বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দেয় প্রসিকিউশনের তদন্ত দল। এর আগে ১৯৭৪ সালের ১০ অগাস্ট টিপু সুলতানকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে তিনি ছাড়া পেয়ে যান। পরে ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি বিস্ফোরক আইনের মামলায় মতিহার থানার পুলিশ টিপু সুলতানকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন জানান, রাজশাহীর বোয়ালিয়ায় ১০ জনকে হত্যা, দুইজনকে দীর্ঘদিন আটকে রেখে নির্যাতন, ১২ থেকে ১৩টি বাড়ির মালপত্র লুট করে আগুন দেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে পাওয়া গেছে। তবে, ছয়জনের মধ্যে মনো, মজিবর রহমান, আবদুর রশিদ সরকার, মুসা ও আবুল হোসেন আগেই মারা গেছেন। বেঁচে আছেন একমাত্র টিপু সুলতান। গত বছরের ২৯ মে প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে ৮ আগস্ট অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে টিপুর বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এর আগে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৪ জন এ মামলার শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষে সাক্ষ্য দেন। এছাড়া রাজশাহী জেলার রাজাকার তালিকা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের রাজনৈতিক অধিশাখা এবং ১৯৭১ সালে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনও জব্দ তালিকার সাক্ষী হিসেবে তুলে ধরা হয়।

টিপু রাজাকারের অভিযোগ-১: একাত্তরের ২৬ সেপ্টেম্বর দুপুর দেড়টা থেকে পরদিন মধ্যরাত পর্যন্ত আসামি মো. আব্দুস সাত্তার ওরফে টিপু সুলতান ওরফে টিপু রাজাকার স্থানীয় অন্যান্য রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা বোয়ালিয়া থানার সাহেব বাজারের এক নম্বর গদিতে (বর্তমানে জিরো পয়েন্ট) হামলা চালিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা বাবর মণ্ডলকে আটক করে। তাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুজ্জোহা হলে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে দিনভর নির্যাতন করার পর গুলি করে হত্যা করে লাশ মাটিচাপা দেওয়া হয়।

টিপু রাজাকারের অভিযোগ-২: একাত্তরের ২ নভেম্বর রাত আনুমানিক ২টায় আসামি টিপু সুলতান, স্থানীয় রাজাকার এবং ৪০ থেকে ৫০ জন পাকিস্তানি সেনা বোয়ালিয়া থানার তালাইমারী এলাকায় হামলা চালায়। সেখান থেকে আওয়ামী লীগ নেতা চাঁদ মিয়া, আজহার আলী শেখসহ ১১ জনকে আটক করে নির্যাতন চালানো হয়। তালাইমারী এলাকার ১২ থেকে ১৩টি বাড়ি লুটপাটও চালানো হয়। পরে আটক ১১ জনকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হলে বসানো অস্থায়ী ক্যাম্প ও টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ৪ নভেম্বর মাঝরাতে নয় জনকে গুলি করে হত্যার পর লাশ মাটিচাপা দেওয়া হয়। সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যাওয়া বাকি দুই জনের মধ্যে একজন এখনও জীবিত আছেন। তিনিও এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন।