টিপু সুলতানের ২৭০ তম জন্মদিন আজ । ছবি: প্রতীকী

নিউজ ডেস্ক: আজ টিপু সুলতানের ২৭০ তম জন্মদিন। ভারতের কর্নাটক প্রদেশের অন্তর্গত মহীশূর (Mysore)। এই মহীশূরের রাজা বীরপুরুষ, মহীশূরের বাঘ টিপু সুলতান ১৭৮২-১৭৯৯ খিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজ্য শাসন করেন।

১৭৮২ সালের ২৯ ডিসেম্বর পিতা হায়দর আলীর ইন্তেকালের পর তিনি সিংহাসনে বসেন। পিতা হায়দার আলী মৃত্যুর আগে বড় ছেলে টিপু সুলতানকে উত্তরাধিকার নিয়োগ করেন। তার মায়ের নাম ফাতেমা কামরুন্নেসা।

টিপু সুলতান ১৭৫০ সনের ২০ নভেম্বর কর্নাটকের রঙ্গপুত্তনায় জন্ম গ্রহণ করেন, মৃত্যু ১৭৯৯ সালের ৪ মে। টিপু শব্দের অর্থ বাঘ। এক দরবেশের নাম অনুসারে এই নামকরণ। টিপু বীরপুরুষ ছিলেন বলে বাঘকে প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেন। সিংহাসনে বাঘের প্রতিমূর্তি খচিত করেন। পূর্ণনাম-নাজির আদ দেওয়ান সুলতান ফতেহ আলী সাহাব টিপু।

তিনি একজন প্রজাদরদী শাসক ছিলেন। তাঁর শাসনকালে ভূমি সংস্কার, নতুন মুদ্রা প্রচলন, সিল্কশিল্প স্থাপন, অর্থনৈতিক সংস্কারসহ বহু জনকল্যাণমূলক কাজ হয়। ভারত উপমহাদেশের যুদ্ধের ইতিহাসে তিনিই প্রথম রকেট আর্টিলারী ব্যবহার করেন। ইংরেজ- মহীশূর যুদ্ধে এই অস্ত্র ব্যবহার করা হয়।

কর্নাটক প্রদেশের বাঙ্গালোরের কাছে রঙ্গপুত্তনায় তাঁর সমাধি। এখনো তাঁর রাজত্বকালের বহু ঐতিহাসিক স্মৃতি বর্তমান। ভেলোর স্থানে আছে তার সেনানিবাস ও টিপু মসজিদ। মসজিদের পাশে রয়েছে তার স্ত্রী, সন্তান ও জামাতাদের কবর। অযত্নে বিলীন হয়ে যাচ্ছে এসব স্মৃতিচিহ্ন।

শাসনকালে তিনি ইংরেজদের দমন করার জন্য ফরাসী নেতা নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষর করেন। ফরাসী সেনারা তার সৈন্যবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দান করে। ইংরেজদের সঙ্গে কমপক্ষে ৫ বার যুদ্ধ করেন। শেষযুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন। হায়দ্রাবাদের রাজা ও মারাঠাশক্তি ইংরেজদের সঙ্গে যোগ দেয়। ৫ম ইংরেজ-মহীশূর যুদ্ধে ইংরেজ সেনাদলে ৫০,০০০ সেনাসদস্য যোগ দেয়। টিপু সুলতানের সৈন্যসংখ্যা ছিল ৩০,০০০।

জন্মস্থান রঙ্গপুত্তনায় রাজধানী স্থাপন করে তিনি রাজ্য শাসন করতেন। শেষযুদ্ধে রঙ্গপুত্তনা রক্ষা করতে বীরদর্পে যুদ্ধ করে শহীদ হন। তাঁকে আত্মসমর্পণ অথবা পালানোর প্রস্তাব দিলে তিনি বলেন,’ভেড়া হয়ে হাজার বছর বাঁচার চেয়ে বাঘ হয়ে একদিন বাঁচা অধিক সম্মানজনক’ (It is better to live one day as a tiger than a thousands years as a sheep.)।

টিপু সুলতান আরবি, ফারসি, উর্দু, কানাড়া ভাষা জানতেন। তাঁর সামরিক প্রশিক্ষক ছিলেন মীর মঈন উদ্দিন। ১৭ বছর বয়সে তিনি সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হায়দর আলীও সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন।

প্রথম ইংরেজ- মহীশূর যুদ্ধ হয় ১৭৬৬ সনে। শেষ যুদ্ধ ১৭৯৯ সালে। তিনি তাঁর পিতার সঙ্গে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ অংশ নেন। ইংরেজদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় যুদ্ধে ২০০ ইংরেজ বন্দি হয়। মারাঠাশক্তি তাঁর পরাজয়ের অন্যতম কারণ। সন্ধিচুক্তি থাকা সত্ত্বেও ১৭৯৯ সনের যুদ্ধে মারাঠা অধিপতি পেশবা মাধব রায় ইংরেজদের পক্ষে যোগ দেয়। হেক্টর মনরো, লর্ড কর্নওয়ালিস তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কয়েকবার পরাজিত হন।

ইংরেজ-মারাঠা জোটের কাছে পরাজিত হয়ে টিপু সুলতান গজেন্দ্রগাদের সন্ধি করেন। এ সময় তাঁকে ৬০,০০০০০ মুদ্রা জরিমানা দিতে হয়। টিপুর সেনাপতি মীর সাদিক শেষ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে বেঈমানী করে।

শ্রী রঙ্গপুত্তনা তাঁর প্রিয় স্থান। তাই এই প্রিয় স্থানেই যুদ্ধ করে তিনি জীবন দান করেন। ১৭৯২ সনে বাঙ্গালোর হাতছাড়া হলে তিনি সন্ধি করেন। এ জন্য তিন কোটি মুদ্রা জরিমানা দিতে হয়।

ইংরেজ শাসনের চরম বিরোধী ছিলেন তিনি। ফরাসি প্রযুক্তিতে এমন একটি বাঘ নির্মাণ করেন যার মুখে ছিল কোনো ইংরেজের লাশ। এটি বর্তমানে লন্ডনে ম্যানচেস্টার যাদুঘরে রক্ষিত। টিপু সুলতানের ব্যবহৃত তরবারিও এখানে রাখা আছে।

তিনি শিকার করতে ভালোবাসতেন। জনশ্রুতি আছে, একবার বাঘ তাঁকে আক্রমণ করলে তিনি বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করেন এবং ছুরিকাঘাতে বাঘ হত্যা করেন। তাঁর জন্মস্থান শ্রী রঙ্গপুত্তনা কাবেরী নদীর তীরে অবস্থিত। মৃত্যুর পর তাঁকে এই স্থানেই পিতা-মাতার কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।

তাঁর ৪ স্ত্রী, ১৫ জন পুত্র, ৮ জন কন্যা ছিল। তিনি হিন্দুবিদ্বেষী ছিলেন বলে মনে করা হয়। কিন্তু এমন কোনো ঐতিহাসিক তথ্য মেলেনা। তাঁর সময়ে হিন্দুরা যথারীতি মন্দিরে পূজা করতো। ভেলোরে রয়েছে এক বিশাল প্রাচীন হিন্দু মন্দির যা টিপু সুলতানের সেনানিবাসের পাশে অবস্থিত।

ভারতের সরকার জাতীয়ভাবে তাঁর জন্ম-মৃত্যু দিবস পালন করতো। বিশেষ করে জাতীয় কংগ্রেস। বর্তমান জনতা পার্টির শাসনকালে আর টিপু সুলতানকে ঘিরে আর কোনো অনুষ্ঠান হয়না। ১৯৯০ সালে বলিউড টিপু সুলতানের জীবনভিত্তিক ‘সোর্ড অফ টিপু সুলতান’ নামে এক সিনেমা নির্মাণ করে।

ভেলোর টিপু সুলতান মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁর মা, স্ত্রী, ২ কন্যা, এক জামাতা ও অন্যান্য অনেক আত্মীয় ও পরিবার সদস্যের কবর রয়েছে। হায়দর আলীর স্ত্রী বকশি বেগম ও বালহা বেগম ( মৃত্যু- ১৮০৪ সন); টিপু সুলতানের কন্যা ফাতেমা বেগম (মৃত্যু- হিজরি ১০৩৫); মন্ত্রী আফতাব খাজা, জামাতা মির্জা হাসান রাজা (মৃত্যু- ১৮৩১) এখানে চিরশায়িত। সিএমসিএইচ হাসপাতালের পাশেই রয়েছে তাঁর বিশাল সেনানিবাস।

ভারতের ইতিহাস ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে, ব্রিটিশ বিতাড়ন আন্দোলন ও যুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর নাম চির অক্ষয় হয়ে থাকবে।

(সংগৃহীত)