নিজস্ব প্রতিবেদক: নাটোরে বেসরকারি জনসেবা হাসপাতালে রোগীর শরীর থেকে কিডনি চুরির অভিযোগে দায়ের করা মামলা সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল আদালত।

বুধবার (২০ মার্চ) বিকেলে অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদ এই আদেশ দেন। আদেশে আগামী ১৬ এপ্রিলের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি নাটোরে রোগীর শরীর থেকে কিডনি চুরির অভিযোগে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারি অধ্যাপক ডা. এমএ হান্নান এবং জনসেবা হাসপাতালের পরিচালক রফিকুল ইসলামসহ ৪জনকে আসামি করে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন সিংড়া উপজেলার ছোট চৌগ্রাম এলাকার ফজলু বিশ্বাস। এর আগে ২০১৫ সালে ওই ক্লিনিকে আসমা বেগমের (৫০) কিডনির পাথর অপসারণ করেন জনসেবা হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. এমএ হান্নান।

নাটোর সদর থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক মাসুদ রানা ও রোগীর স্বজনরা জানিয়েছিলেন, আসমা বেগম পেটের ব্যথায় জনসেবা হাসপাতালে ভর্তি হয়। পরে সেখানে তার পিত্তথলিতে পাথরের কথা বলে অপারেশন করতে হবে বলে জানায়। এর প্রায় এক মাস পর রোগীর অপারেশন করা হয়। অপারেশনের সময় রোগীর আরো একটি অপারেশন করতে হবে বলে জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এরপর থেকে রোগী আরো অসুস্থ হয়ে পড়লে পুনরায় রোগীর পরীক্ষা করা হয় ওই হাসপাতালেই। সেখান থেকে জানতে পারে রোগীর শরীরের ডান পার্শের একটি কিডনি নেই। এরপর থেকে রোগীর স্বজনরা বিভিন্ন হাসপাতালে পরীক্ষা করে জানতে পারে তার শরীরের একটি কিডনি কেটে নেওয়া হয়েছে। আসমা বেগম পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম করানোর পর কিডনি দৃশ্যমান না হওয়ায় এ অভিযোগ উঠে। পরে তার স্বজনরা কিডনি চুরির অভিযোগে গত ৩ ফেব্রুয়ারি ওই ক্লিনিকে গিয়ে অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক এমএ হান্নানের ওপর চড়াও হন রোগীর স্বজনরা।

এ ঘটনায় ওই দিনই নাটোর সদর থানা পুলিশ ডা. এমএ হান্নানকে আটক করলেও সিভিল সার্জন ও বিএমএ নেতাদের হস্তক্ষেপে ছেড়ে দেয়। এরপর ডা. এমএ হান্নানসহ ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ দেন আসমা। বিএমএর কেন্দ্রীয় কাউন্সিলর ডা. এমএ হান্নান রামেকের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) নেতারা দাবি করেন, জনসেবা হাসপাতালে অস্ত্রোপচারকালে রোগীর কিডনি চুরির অভিযোগ ভিত্তিহীন। সংবাদ সম্মেলনের আগে বেলা ১১টার দিকে তারা রামেকের প্রধান ফটকের সামনের সড়কে মানববন্ধন করেন।

সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বিএমএ রাজশাহী শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. খলিলুর রহমান বলেন, রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল ছাড়া দেশের আর কোথাও রোগীর কিডনি প্রতিস্থাপন সম্ভব নয়। কিডনি বের করে নিলে অন্য কোথাও তা সংরক্ষণও করা যাবে না। তাই ডা. এমএ হান্নানের বিরুদ্ধে রোগীর কিডনি বের করে নেয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন।

তিনি আরো বলেন, ইচ্ছা করলেই রোগীর কিডনি বের করে অন্য কারও শরীরে প্রতিস্থাপন সম্ভব নয়। এজন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) সুবিধাসহ দক্ষ নার্স ও মেডিকেল সুযোগ-সুবিধা লাগে। এসবের কিছুই নাটোরের ওই বেসরকারি হাসপাতালটিতে নেই। আর কোনো একজন চিকিৎসকের পক্ষে রোগীর কিডনি অপসারণ সম্ভবও নয়।

ডা. খলিলুর রহমান বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক ওঠায় ওই রোগীর কিডনি আছে কি না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার দায় দেয়া হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। সেই পরীক্ষার প্রতিবেদনের পর নিশ্চিত হওয়া যেতো, ওই রোগীর কিডনি আছে কি না। এরপর পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতো। কিন্তু পরীক্ষা করার জন্য হাসপাতালের পক্ষ থেকে রোগীকে আনার জন্য তার বাড়িতে গাড়ি পাঠানো হলেও তিনি আসেন নি। রহস্যজনক কারণে তিনি পরীক্ষা এড়িয়ে আদালতে মামলা করেছেন।

তিনি আরো বলেন, ঘটনা তদন্তে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। তিন দিনের মধ্যে পুলিশকে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য এই কমিটিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু রোগী পরীক্ষা না করায় তদন্ত কমিটি কোনো প্রতিবেদন দিতে পারেনি। এর দায় ওই রোগীর।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিএমএ কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ডা. তবিবুর রহমান শেখ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মহিবুল হাসান, বিএমএ রাজশাহী শাখার সভাপতি ডা. এসআর তরফদার, রামেকের অধ্যক্ষ ডা. আনোয়ার হাবিব, উপাধ্যক্ষ ডা. নওশাদ আলী প্রমুখ।