বিশেষ প্রতিবেদক: নাটোর সদর উপজেলার ২নং তেবাড়িয়া ইউনিয়নে হতদরিদ্রদের জন্য সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি জানাজানি হলে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড ও কিছু টাকা ফেরত দিয়ে বিষয়টি গোপন করার চেষ্টা করছেন ইউপি সদস্য আজিজুল হক ভোলা ও অভিযুক্ত ডিলার মামুনুর রশীদ বাবু।

এ ব্যাপারে ভুক্তভোগীসহ স্থানীয়রা গত ০৩-০৫-২০২০ তারিখে জেলা প্রশাসক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিকার পাননি তারা। অভিযুক্ত ডিলার মামুনুর রশীদ বাবুর অভিযোগ, তালিকা প্রণয়ণে অনিয়ম থাকতে পারে। এছাড়া বিষয়টি সত্য বলে স্বীকার করেছেন তেবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওমর আলী প্রধান।

এছাড়া তেবাড়িয়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আজিজুল হক ভোলার বাবা আনার হোসেন ৩ বছর আগে মারা যাওয়ায় পরও তার নামে যথারীতি বছরের পর বছর চাল উঠছে উত্তোলন করা হয়েছে। এছাড়া ইউপি সদস্য ভোলার স্ত্রী পলি বেগমসহ ৫ জনের নাম ওএমএস কার্ডের সুবিদাভোগী বলে জানা যায়।

এদিকে তালিকা অনুযায়ী যে সকল হতদরিদ্র মানুষের নামে মাসের পর মাস চাল উত্তোলন করা হচ্ছে তারা তা জানেই না তাদের নামে কার্ড হয়েছে। এ সব মানুষের নাম খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকায় থাকলেও করোনার মধ্যেও তাদের ভাগ্যে জোটেনি চাল। মাসের পর মাস বছরের পর বছর তাদের স্বাক্ষর জাল করে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল তুলে নিয়েছে নাটোর সদর উপজেলার তেবাড়িয়া ইউনিয়নের ডিলার মামুনুর রশীদ বাবু ডিলারসহ একটি চক্র।

সরেজমিনে জানা যায়, নাটোর সদর উপজেলার বনবেলঘড়িয়া গ্রামের সুফিয়া বেগম। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে অভাবের সংসারে প্রতিদিন তাকে যুদ্ধ করতে হয়। তিন বছর আগে ভোটার আইডি কার্ড দিয়ে তেবাড়িয়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আজিজুল হক ভোলার মাধ্যমে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে আবেদন করেন তিনি। তালিকা প্রণয়নের পরে তিনি ইউপি সদস্য ভোলার কাছে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড চাইলে তিনি বলেন, তোমার কার্ড হয়নি। তবে সম্প্রতি সুফিয়া জানতে পারে তিন বছর ধরে তার নামে চাল উত্তোলন করা হচ্ছে।

একই গ্রামের প্রতিবন্ধী আলাউদ্দীনের স্ত্রী আঞ্জুমান বেগম জানান, তার প্রতিবন্ধী স্বামী কোন কাজ করতে পারেন না। তিন মেয়ে এবং এক ছেলেকে নিয়ে মানুষের বাসায় কাজ করে সংসার চালান। তালিকায় নাম আছে কি-না জানতে অনেকবার স্থানীয় ডিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি কোনোভাবেই স্বীকার করেননি। কিন্তু তিন বছর পর জানতে পারেন তার স্বামীর নামে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড হয়েছে। এমন কি তার স্বাক্ষর জাল করে কার্ড থেকে ইতোমধ্যে ৫১০ কেজি চাল উত্তোলন করা হয়েছে।

একই অভিযোগ করেছেন বনবেলঘড়িয়া গ্রামের আবুল কাশেমের স্ত্রী তাসলিমা বেগম এবং আলাউদ্দীন প্রামাণিকের ছেলে বাবু প্রামাণিক। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকায় নাম থাকা বাবু মিয়া (৫০) জানান, সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকায় নাম থাকলেও বছরের পর বছর ধরে চাল উত্তোলন করে ভোগ করছে স্থানীয় ডিলার মামুনুর রশীদ বাবুসহ একটি চক্র। বিষয়টি জানাজানি হলে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড ও কিছু টাকা ফেরত দিয়ে বিষয়টি গোপন করার চেষ্টা করছেন ইউপি সদস্য আজিজুল হক ভোলা ও অভিযুক্ত ডিলার মামুনুর রশীদ বাবু।

এ ব্যাপারে ২নং তেবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৫নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল আজিজ ভোলা বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ গুলো সঠিক নয়। ইউপি সদস্য গরিব হলে কি চাল নিতে পারবে না বলে উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার মামুনুর রশীদ বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আমাকে চাল বিক্রির জন্য নিয়োগ করা হয়েছে। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ডধারী আমার আওতায় যারা আছেন তাদের যে কেউ সরকারের নিয়ম অনুযায়ী আমার কাছ থেকে ১০ টাকা কেজি দরে চাল কিনতে পারবেন। এই চাল বিক্রির সময় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অফিসার উপস্থিত থাকেন। তালিকা প্রণয়ণে অনিয়ম থাকতে পারে কিন্তু আমার বিতরণে কোনো অনিয়ম হয়নি। আমাকে ফাঁসাতে প্রতিপক্ষ এসব অভিযোগ করেছে।

বিষয়টি সত্য বলে স্বীকার করেছেন তেবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওমর আলী প্রধান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এমন ঘটনা ঘটলেও ভুক্তভোগী কেউ ইউনিয়ন পরিষদে বিষয়টি জানায়নি। এখন যেহেতু জানা গেছে তাই তালিকা অনুযায়ী সঠিকভাবেই চাল বিতরণ করা হবে। আর আমি এবার আইডি কার্ড এবং ছবি দেখে চাল দেওয়ার কথা বলার পর এবার ডিলারদের কাছে ৪৫ বস্তা চাল থেকে গেছে। এ চাল নেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।

এ ব্যাপারে বনবেলঘড়িয়া এলাকার বাসিন্দা ও গণমাধ্যম কর্মী সাব্বির আহমেদ বলেন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল যদি যাচাই বাছাই করার পর একবার যদি বাঁচে ৪৫ বস্তা। তাহলে বছরে ২২৫ বস্তা চাল বাঁচে। তিন বছরে ৬৭৫ বস্তা চাল আত্মসাৎ করা হয়েছে। অসহায় গরীবের হক যারা মেরে দিয়েছে তাদের কঠোর বিচার হওয়া উচিত ।

নাটোর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, অভিযোগটি পাওয়ার পর আমি তদন্ত করে সত্যতা পাওয়ার পর কার্ডগুলো বাতিল করেছি। বিষয়টি অধিকতর তদন্ত চলছে। তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

কৃতজ্ঞতা: খান মামুন