নিউজ ডেস্ক: আজ মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) প্রতিষ্ঠার ৪৩ বছরে যাত্রা করছে বিএনপি। ১৯৭৮ সালের এই দিনে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে দলটির জন্ম হয়। ১৯৮১ সালে জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির হাল ধরেন তারই সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া। তার নেতৃত্বে বিএনপি ১৯৯১ সাল এবং ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসেছিল।

তবে দলের ৪২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এসে অনেকটাই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি ও বন্যার্তদের সহযোগিতা কার্যক্রমে রয়েছে বলে দাবি দলটি নেতাদের। ৪২তম দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার (৩১ আগস্ট) বাণী দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করে বাণীতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে হয়রানির খড়্গ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। খালেদা জিয়া প্রতিহিংসার শিকার। খালেদাকে গণতন্ত্রের প্রতীক এবং জনগণের নাগরিক ও বাক্-ব্যক্তি স্বাধীনতার পক্ষে প্রধান কণ্ঠস্বর বলে উল্লেখ করে বিএনপির ৪২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে দেশবাসীকে বিএনপির পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।

এছাড়া প্রতিষ্ঠাবাষির্কী উপলক্ষে দলের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কর্মসূচী নেয়া হয়েছে। সকালে দল ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করবেন। ১১টায় শেরে বাংলানগরে অবস্থিত মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। এছাড়া রয়েছে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভার আয়োজন।

প্রসঙ্গত, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হন। ৭ নভেম্বর সামরিক অভ্যুত্থানের পর তিনি শাসন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন; ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন তিনি।

এরপর ১৯৭৭ এর ২১ এপ্রিল বিচারপতি আবু সাদাত সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে যেতে হয়, জিয়া তখন ওই দায়িত্বও নেন। সে সময় জিয়ার সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টায় একটি গণভোটের আয়োজন করা হয়, যাতে ৯৮.৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে।

সামরিক আইন প্রশাসক থাকা অবস্থায় জিয়াউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) নামে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠিত হয়। তবে সে দল তখন দেশের রাজনীতিতে নাড়া দিতে পারেনি।

পরে একই বছর ১ মে জিয়াউর রহমানকে চেয়ারম্যান করে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ ঘোষণা করা হয়। সেনাবাহিনী প্রধানের পদে থেকে পুরাদস্তুর রাজনীতিবিদ বনে যান জিয়া। ৩ জুন নির্বাচন দিয়ে ওই ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ থেকে প্রার্থী হয়ে তিনি ‘নির্বাচিত’ রাষ্ট্রপতি হন।

নির্বাচনের তিন মাসের মাথায় ১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁয় এক সংবাদ সম্মেলনে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।

এর মধ্যে জাগদল, মশিউর রহমান যাদু মিয়ার নেতৃত্বাধীন ন্যাপ, আবদুল হালিম-আকবর হোসেনের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস পার্টি, আব্দুল মতিনের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টি ও শাহ আজিজুর রহমানের মুসলিম লীগ বিলুপ্ত হয়ে যায় জিয়ার বিএনপিতে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত জিয়া রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন।

জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার এক বছরের মধ্যে রাজনীতিতে নেমেই দলের ভাইস চেয়ারম্যান পদ নেন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া। তখন বিএনপির চেয়ারম্যান ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার।

সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ ১৯৮২ সালে বিএনপি হটিয়ে ক্ষমতা দখল করলে সাত্তারের অসুস্থতার মধ্যে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের পদ নিয়ে দলের হাল ধরেন খালেদা। তারপর ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন খালেদা। সেই থেকে খালেদা এই পদে রয়েছেন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার পর দুইবারসহ তিনবার তার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি। বিএনপির প্রাণ বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপিকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া এবং জনপ্রিয় দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কৃতিত্ব খালেদা জিয়ার। তবে মামলা-মোকাদ্দমায় জর্জরিত খুবই ‘কঠিন সময়’ পার করছে দলটি।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জনের পর পাঁচ বছর সংসদের বাইরে থাকতে হয় বিএনপিকে। কয়েক দফা সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেও সফল হননি খালেদা, বরং ২০১৫ সালে তিন মাসের হরতাল-অবরোধের মধ্যে জ্বালাও-পোড়াওয়ের জন্য তাকেই দায়ী করে আসছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে দুর্নীতি মামলার সাজায় কারাগারে যেতে হলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান ছেলে তারেক রহমান, যিনি গত এক যুগ ধরে লন্ডনে অবস্থান করছেন। এর মধ্যে দেশে তিনটি মামলায় তার সাজার রায় এসেছে।

খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই ২০১৯ সালের নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। তাতে চরম ভরাডুবির পর সরকারের বিরুদ্ধে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন বিএনপি নেতারা। এর মধ্যে গত ২৫ মার্চ সরকারের নির্বাহী আদেশে সাময়িক মুক্তি পাওয়ার পর থেকে নিজের বাসাতেই আছেন খালেদা জিয়া।