করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সদ্য প্রয়াত নাটোরের বড়াইগ্রাম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুমন আলী। ছবি: সংগৃহীত

সৈকত হাসান: শেষ পর্যন্ত তোকে নিয়ে অজানা আশঙ্কাটাই সত্যি হলো। তোর সাথে কথা বলতে আর সামনাসামনি যেতে হবে না। কিংবা ফোনও করতে হবে না। তুই এখন মানব সৃষ্টি সীমানার অনেক ওপরে। ইচ্ছে হলেই তুই এখন সকল কিছু বলতে পারবি, শুনতে পারবি সকল কিছু। তোকে তো আর কেউ বদলী করতে পারবে না। তুই এখন জাগতিক বদলীর অনেক উর্ধ্বে। তোকে আর কেউ শাস্তি দিতে পারবে না।

তুই এখন জাগতিক শাস্তির বাইরের লোক। তুই এখন মনখুলে হাসতে পারবি তথাকথিত ‌‘ভার্চুয়াল মানবতার ফেরিওয়ালা’দের মানবতা ফেরি করতে দেখে যারা কিনা ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ছাড়া মানবতা ফেরি করতে পারে না। তোর এখন রাস্তায় ডাকাতি হওয়া গরুগুলো উদ্ধার করার কোন তাড়া নেই, নেই কোন শাস্তির ভয়। তোর পোষ্টিং হওয়ার আর কোন ভয় নেই। সবচেয়ে বড় পোষ্টিং তো তোর হয়ে গেছে।

আসলে সুমনকে নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি। শেষবেলায় কেন জানি সুমনের সাথে খুব একটা সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। একসাথে ট্রেনিং করেছি এক বছর। কিন্তু ট্রেনিংয়ের সময় পরিচয়টা ঠিকমত হয়ে ওঠেনি। সুমনের সাথে আমার পরিচয়, ও যখন সিরাজগঞ্জ জেলায় যমুনা থানায় চাকরি করে। থানাটা ছিল আমার বাড়ীর কাছাকাছি। পরে অনেক দিন কোন দেখা হয় নাই।

এরপরে হঠাৎ একদিন পদোন্নতি সূত্রে যেদিন রাজশাহী রেঞ্জে রিপোর্ট করতে যাই সেদিন সুমনও রেঞ্জে রিপোর্ট করতে এসেছিল। পরবর্তীতে দুইজনের নাটোর জেলায় পোস্টিং হলো। নাটোরে রিপোর্ট করার পর সুমনের পোস্টিং হলো নাটোর সদর থানায় ইন্সপেক্টর (অপারেশন) হিসেবে আর আমার পোস্টিং হলো বড়াইগ্রাম থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) হিসেবে।

আমার আগের ইউনিট ছিল নাটোর সদর থানা। পরে আমার যখন নাটোর ডিবিতে পোস্টিং হয় তখন ওর পোস্টিং হয় বড়াইগ্রাম থানায় ইন্সপেক্টর (তদন্ত) হিসেবে। যখন পোস্টিং হয় তৎকালীন পুলিশ সুপার স্যার আমাকে কেন জানি খুব পছন্দ করতেন। স্যার আমাকে সুমনের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। আমি বলেছিলাম, স্যার সুমন কারো উপকার করতে পারবে কিনা জানি না, তবে ওর দ্বারা কারো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নাই।

দিলীপ স্যার ওসি হিসেবে খুব ভাল মানুষ এবং সুমন দিলীপ স্যারের কাছে খুব ভাল ছিল। সুমন যেভাবেই হোক আমি যে এসপি স্যারের কাছে ওর বিষয়ে সুপারিশ করেছিলাম সেটা জানতে পেরেছিল। এরপর ও আমার প্রতি ভীষন কৃতজ্ঞ ছিল। ও মাঝে মাঝেই আমাকে বলত, বন্ধু তুমি আমাকে না জানিয়েই আমার পেস্টিং এর বিষয়ে স্যারের কাছে তদবির করেছ, আমি যে তোমার প্রতি কি রকম কৃতজ্ঞ তা প্রকাশ করতে পরব না।

আসলে সুমনের অবস্থা ছিল আমারই মতো। এই পুলিশ বিভাগে উপরওয়ালা ছাড়া আমার মতো ওরও কেউ নেই। এখানে চাকরি করতে হলে শুধু মাথার উপর আল্লাহ থাকলেই চলে না, আরো কাউকে না কাউকে থাকতে হয়। আমাদের কারোরই সেটা ছিল না। যার ফলে পদে পদে হিসেব করে পথ চলতে হয়, পথ পিছলে গেলে টেনে তোলার কেউ নেই।

শেষদিকে সুমন আমাকে মাঝে মাঝেই বলত, বন্ধু আমার আর ভাল লাগছে না, দেখ যদি বলে কয়ে একটু ডিএসবিতে পোস্টিং করা যায় তবে ভাল হত। কিন্তু তখন আমিই ছিলাম রেজিষ্টেশন বিহীন মোটরসাইকেলের মতো। আমার কিছু করার ছিল না। আমি ওকে মজা করে বলেছিলাম, আমি যেখান থেকে চলে আসি তোর সেখানে পোস্টিং হয়। সে হিসেবে তোর ডিবিতে পোস্টিং হওয়ার কথা।

সবশেষ সুমনের সাথে যেদিন কথা হয় সেদিন ও বলেছিল, বন্ধু তুই আবার রাজশাহী রেঞ্জে চলে আয়। তুই আসলে আমার বিশ্বাস, তুই আমার একটা গতি করে দিতে পারবি।

সেই আমার আর আসা হলো না, কিন্তু সুমনের গতি হয়ে গেল চিরদিনের জন্য। বড়াইগ্রাম থানা একটি অপরাধপ্রবণ থানা। বিশাল এক হাইওয়ে থানা এলাকার ভিতরে আছে। মাঝেমাঝেই নানারকম ঘটনা ঘটে। এই করোনাকালেও বেশকিছু ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটা ঘটনাতেই দেখতাম সুমন অপারেশনে বিভিন্ন জেলায় যেত।

আমার সাথে কথা হলে বলতাম, দেখ তোর এ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট আছে, তুই এত বাইরে যাস কেন?

ও বলত, বন্ধু কি করব বল, এত এত ঘটনা ঘটছে প্রতিটাতেই যেতেই হচ্ছে। কোন উপায় নাই বন্ধু।

আসলে সুমন চেষ্টা করত পরিশ্রম বেশী করে ঘাটতিটা পুষিয়ে দিতে। জন্ম, মৃত্যু সব আল্লাহর হাতে, তবে যেহেতু ও শ্বাসকষ্টের রোগী ছিল সেহেতু এই করোনাকালে ও একটু ছাড় পেলে খুব একটা ক্ষতি হতো বলে আমার মনে হয় না।

সবশেষ ও নারায়নগঞ্জ যায় একটি ডাকতি মামলা তদন্তে। সেখানেই আসলে ক্ষতি যা হবার হয়ে যায়। ও তো আগে থেকেই শ্বাসকষ্টের রোগী। করোনা ওর জন্য আরো কাল হয়ে দাঁড়ালো। অনেকেই শোক জানাচ্ছে। অনেকের মতো আমিও শোক জানাচ্ছি। কিন্তু একসময় সুমনের মৃত্যুটা আমাদের কাছে একটা সংখ্যা হয়েই থাকবে।

শোকবার্তাগুলো একসময় স্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে। আবারো মামলা ডিটেক্ট না হলে শোকজ, বদলী বিভিন্ন আশঙ্কায় পেয়ে বসবে আমাদের। আর মোবাইলে তিরস্কারমূলক বাণী গিলতে হবে বস্তায় বস্তায়। জীবনের জন্য চাকরি করি, এই ধারনাটাই পাল্টে যাবে, মনে হবে চাকুরির জন্যই জীবন। সুমনের মেয়েটাকে সান্তনা দেবে কে? সবকিছুর পরে সান্তনা একটাই, বদলীর আর শঙ্কা নাই, চাকরি হারানোর আর ভয় নাই রে সুমন!

লেখক: ওসি (তদন্ত) সৈকত হাসান

কৃতজ্ঞতা: জাহিদ হাসান