নিজস্ব প্রতিবেদক: বাগাতিপাড়া উপজেলার চন্দ্র খৈইড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মুন্নী পারভীন নামের একজন সহকারী শিক্ষিকা মাদক মামলায় গ্রেফতারের পর জামিনে মুক্ত হয়ে সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সেই সংবাদ সম্মেলনে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন শিক্ষক মুন্নী পারভীন। এরপরই স্থানীয়রা সেই শিক্ষিকার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে কুশপুত্তলিকা দাহ করেছেন। সাধারণভাবে গ্রেফতারের ঘটনায় স্বস্তির পর মুক্তির কারণে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয়রা। তবে স্থানীয়রা পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করছেন। কিন্তু ক্ষোভের নেপথ্যে মাদক ব্যবসা বললেও সেই শিক্ষিকার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে গ্রাম্য জটিল রাজনীতি সামনে চলে এসেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়দের মধ্যে অপর একটি পক্ষ।

রোববার (২০ জানুয়ারি) বিকেলে বাগাতিপাড়া উপজেলায় দয়ারামপুর ইউনিয়নের হাটগোবিন্দপুর এলাকাবাসীর ব্যানারে হাটগোবিন্দপুরের অদূরে চাঁদপুর বাজার এলাকায় মুন্নী পারভীনের শাস্তি চেয়ে বিক্ষোভ ও ঝাঁড়ু মিছিল করেছেন তারা। এসময় এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন, মুন্নী পারভীন শিক্ষকতার আবরণে কয়েক বছর ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন রমরমা মাদক ব্যবসা। যদিও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সহযোগিতা ছাড়া বর্তমানে সময়ে এত বড় মাদক ব্যবসা কিভাবে সম্ভব, আর এর সাথে আরো কারা যুক্ত এমন প্রশ্নের উত্তর সবাই এড়িয়ে গেছেন। এমনকি স্কুলের ছোট ছোট শিশু ছাত্রদেরকে এই বিক্ষোভ করে কুশপুত্তলিকা দাহের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এসময় ছোট ছোট শিশু ছাত্রদের হাতে অসংখ্য কম্পিউটারে প্রিন্ট করা লিফলেট দেখা যায়।

মিছিল শেষে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, এলাকায় মুন্নীর শেকড় এতটাই শক্ত যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও প্রমাণের অভাবে তাকে এতদিন ধরতে পারেনি। মুন্নী পারভীন এলাকায় মাদক রাজত্ব চালিয়ে যুব সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র যখন মাদক নির্মূলে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে, তখন মুন্নীর মতো একজন মাদক সম্রাজ্ঞী খুঁটির জোরে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। মাসখানেক আগে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ মুন্নী পুলিশের হাতে আটক হলে এলাকাবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়ে সে আবারো মাদক ব্যবসা শুরু করেছে। জামিন পেলেও মুন্নী তার মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে একাট্টা পুরো এলাকাবাসী।

এদিকে গত শনিবার নাটোর শহরের একটি বিলাসবহুল রেস্তরায় রাজসিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন শিক্ষক মুন্নী পারভীন। তার এই সংবাদ সম্মেলনের পরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয়রা। একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একজন শিক্ষিকার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ের মত গুরুতর অভিযোগ সম্পর্কে খোঁজ নিতে গেলে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে তার নিজ এলাকায়। কিন্তু স্থানীয়রা পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করছেন তাতে সত্য মিথ্যা যাছাই করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে গণমাধ্যমকর্মীদের।

এলাকাবাসী আরো অভিযোগ করেছেন, মুন্নী পারভীন গত কয়েক বছর ধরে মাদক ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। ২০১৪ সালে হাটগোবিন্দপুর এলাকায় একটি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামী ছিলেন মুন্নী পারভীন। তবে শেষ পর্যন্ত খুঁটির জোরে চার্জশীটে আসেনি তার নাম। এছাড়া তার স্বামী আমির হোসেনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ঘর পোড়ানো, শিশু অপহরণ ও মাদক মামলাসহ বাগাতিপাড়া থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। ২০১৮ সালের ১৭ই ডিসেম্বর রাতে নিজ বাড়িতে অভিযান চালিয়ে এক বস্তা গাঁজাসহ উপজেলার দয়ারামপুর ইউনিয়নের চন্দ্রখৈর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মুন্নী পারভিনকে (৩১)স্বামী আমির হোসেন (৩৫) ও মা নাসিমা বেগম (৫০) সহ আটক করে বাগাতিপাড়া থানা পুলিশ।

সে সময় গণমাধ্যমকে জানানো হয়, পুলিশের কাছে দীর্ঘদিন ধরে তথ্য ছিল, ওই বাড়িতে বিপুল পরিমাণে গাঁজা মজুদ রয়েছে এবং সেখান থেকে পাশ্ববর্তী রাজশাহীর দুইটি উপজেলায় সেগুলো নিয়মিত বিক্রি করা হয়। ওইদিন বিকেলে গাঁজা মজুদের বিষয়টি অধিকতর নিশ্চিত হয়ে অভিযানে নামে পুলিশ। সন্ধ্যার পর পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আটককৃতরা বাড়ির সকল দরজা বন্ধ করে চিৎকার করে গ্রামবাসীদের ডাকতে শুরু করে। পরে গ্রামবাসীদের উপস্থিতিতে অতিরিক্ত পুলিশ সহ মুন্নীর বাড়িতে অভিযান চালায়। প্রায় তিন ঘন্টা অভিযান চালিয়ে তাদের শোবার ঘরের মধ্যে খাটের নিচে বস্তায় রাখা এবং বাথরুমসহ বিভিন্নস্থানে রাখা প্রায় এক বস্তা পরিমান গাঁজা উদ্ধার করে পুলিশ।

আরো জানানো হয়, উদ্ধার হওয়া গাঁজার পরিমান প্রায় সাড়ে ৮ কেজি। ওই রাতেই বাদী হয়ে বাগাতিপাড়া থানার উপ-পরিদর্শক খাইরুল ইসলাম বাদী হয়ে ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে আটক ৩ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করে।

এরপর গত ২০ শে ডিসেম্বর নাটোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এরশাদ উদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত এক আদেশে মুন্নী পারভীনকে আটকের দিন থেকেই বরখাস্ত করা হয়। ওই মামলায় ৩দিন কারাগারে থেকে জামিনে বেরিয়ে আসেন মুন্নী পারভীন।

অন্যদিকে, চলমান মাদক উদ্ধার অভিযানগুলোর মতো এই অভিযান ছিল না বলে জানিয়েছেন সেদিন মাদক উদ্ধারে অংশ নেয়া পুলিশ সদস্যরা। একজন শিক্ষিকার বাড়ি থেকে মাদক উদ্ধারের অনুমতির নিতে হয়েছিল জেলা পুলিশের কর্মকর্তাদের নিকট থেকে, যা মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।

আটকের পর মুন্নী পারভীনকে ছেড়ে দিতে অনেক হোমড়া-চোমড়া ব্যক্তিরা থানার অফিসার ইনচার্জকে চাপ দিলেও কারো অনুরোধ রাখেননি বলে কেউ কেউ বলছেন। তবে এর সত্যতা যাছাই করা যায়নি। অনেকে গুরুতর অভিযোগ করলেও সেই হোমড়া-চোমড়া ব্যক্তি কারা তাদের কারো নাম বলতে পারেনি কেউ।

দয়ারামপুর ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ড সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, মুন্নী পারভীন এরাকার একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। গত মাসে মুন্নী বিপুল পরিমাণে মাদক সহ আটক হওয়ার পরও জামিনে মুক্ত হয়ে আবার মাদক ব্যবসা শুরু করেছে। এ নিয়ে এলাকায় ক্ষোভ বিরাজ করছে।

৪ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রসুল বলেন, মুন্নী পারভীন এলাকায় অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থেকে যুব সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। তার শাস্তির দাবীতে মানুষ এখন রাস্তায় নেমেছে। ইতোপূর্বে তার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ ওঠে। অর্থের জোরে বারবার সে পার পেয়ে যাচ্ছে। মাদক ব্যবসা না করলে এতো টাকার মালিক হওয়া যায় না।

দয়ারামপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাহবুব আলম মিঠু বলেন, মুন্নী পারভীনের কারণে এলাকা ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আমরা বারবার মুন্নীর মাদক ব্যবসায় নিয়ে অবহিত করেছি। তারা মুন্নীকে আটক করলেও অদৃশ্য শক্তির জোরে সে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। নতুন করে মাদক রাজত্ব বিস্তার শুরু করেছে এলাকায়। আমরা বিব্রত একজন শিক্ষিকার এমন মাদক ব্যবসার জন্য।

এব্যাপারে অভিযুক্ত মুন্নী পারভীন দাবি করেন, তার সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন করতে এলাকার কিছু মানুষ জোট বেঁধেছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কেন মানুষ জোট বেঁধেছে তার পরিষ্কার ধারণা দিতে পারেননি তিনি।

বাগাতিপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ শরিফুল ইসলাম জানান, মুন্নী পারভীনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা চলছে। তিনি জামিনে বেরিয়েছেন বলে শুনেছি। এ নিয়ে এলাকায় কিছুটা উত্তেজনা বিরাজ করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।