ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়। ছবি: সংগৃহীত

ক্রীড়া প্রতিবেদক: তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম খেলায় ভারতকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। মুশফিকুর রহিমের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ভারতকে ৭ উইকেটে পরাজিত করেছে বাংলাদেশ। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে ১০০০তম ম্যাচ বলে কথা। ২০০৫ সালে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম সংস্করণের হাজারতম ম্যাচটি খেলার সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ। আর এ সুযোগটিকে স্মরণীয়ই করে রাখলেন মুশফিকুর রহীম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদরা। দলের দুই প্রাণভোমরা সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালকে ছাড়াই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো ভারতকে হারিয়েছে বাংলাদেশ।

রোববার (৩ নভেম্বর) দিল্লির অরুন জেটলি স্টেডিয়ামে টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। এর আগে টেস্ট, ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি তিন ফরম্যাটে অতীতে ভারতের মাঠে অজেয় ছিল বাংলাদেশ। সেই না পাওয়ার খড়া কাটালেন মুশফিকরা। তার ৬০ রানের দায়িত্বশীল ইনিংসে ভর করে জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ।

প্রথমে ফিল্ডিং করে জয়ের ভিত গড়ে দেন আমিনুল ইসলাম বিপ্লব ও শফিউল ইসলামরা। তাদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে ভারত মাত্র ১৪৮ রানে ইনিংস গুটিয়ে যায়। পরে ভারতের বিপক্ষে ১৪৯ রানের সহজ টার্গেট তাড়া করতে নেমে শুরুতে উইকেট হারান লিটন দাস। দলীয় ১০ রানে ফেরেন তিনি। এরপর অভিষিক্ত মোহাম্মদ নাইমকে সঙ্গে নিয়ে ৪৬ রানের জুটি গড়েন ওপেনার সৌম্য সরকার। ২৮ বলে ২৬ রান করে ফেরেন নাইম।

এরপর চাহালের লেগ স্পিন থেকে রানই বের করতে পারছিলেন না মুশফিকুর রহিম ও সৌম্য। এর মাঝে একটি জোরালো এলবিডব্লুর আবেদন উঠেছিল মুশফিকের বিপক্ষে। আম্পায়ার তাতে সাড়া দেননি, ভারতও রিভিউ নেয়নি। পরে রিপ্লেতে দেখা গেছে, রিভিউ নিলেই ড্রেসিংরুমে ফিরতে হতো মুশফিককে। পরে দুই ভায়রা মুশফিকুর রহীম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের অবিচ্ছিন্ন ৪০ রানের জুটিতে ম্যাচের ৩ বল বাকি থাকতেই জয় নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের।

শেষ ১২ বলে ২২ রান দরকার ছিল বাংলাদেশের। প্রথম দুই দলে মাত্র ২ এল। পরের চার বলে টানা চার ৪ মুশফিকের। শেষ ওভারে দরকার ৪ রান। তবে উইকেটে থাকা মুশফিক-মাহমুদউল্লাহই একবার শেষ ৩ বলে ২ রান তোলার কাজ করতে পারেননি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। এ তথ্যটাই অস্বস্তি বাড়াচ্ছিল। প্রথম বলেই ডট দিলেন মাহমুদউল্লাহ। ৫ বলে দরকার ৪ রান। অভিষিক্ত শিভাম দুবের করা শেষ ওভারের তৃতীয় বলে অসাধারণ এক ছক্কা হাঁকিয়ে দলকে জেতান অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ।

এর আগে শক্তিশালী ভারতকে তাদের মাঠেই কোণঠাসা করে রাখেন আমিনুল ইসলাম বিপ্লব ও আফিফ হোসেনরা। বাংলাদেশ দলের এ তরুণ বোলারদের মোকাবেলা করতে বেশ হিমশিম খেতে হয় রোহিত শর্মার মতো ভারতীয় অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানদের। সাকিব-তামিমহীন তারুণ্য নির্ভর বাংলাদেশ দলের বিপক্ষে প্রত্যাশার ব্যাটিং করতে পারেনি ভারত। ঘরের মাঠে বাংলাদেশের বিপক্ষে ব্যাটিংয়ে নেমে সময়ের ব্যবধানে উইকেট হারিয়ে কোণঠাসা হয়ে যায় স্বাগতিকরা।

তবে ওপেনার শেখর ধাওয়ানের দায়িত্বশীল ব্যাটিং আর শেষ দিকে করুনাল পান্ডিয়া ও ওয়াশিংটন সুন্দরের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে শেষ পর্যন্ত ৬ উইকেটে ১৪৮ রান তুলতে সক্ষম হয় বিশ্বের অন্যতম সেরা দল ভারত। তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টিতে টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই বিপদে পড়ে যায় স্বাগতিকরা। ভারত শিবিরে শুরুতেই আঘাত হানেন শফিউল ইসলাম।

ভারত সেরা ওপেনার রোহিত শর্মাকে ইনিংসের প্রথম ওভারে ফেরান শফিউল। তার করা ইনিংসের প্রথম ওভারের শেষ বলে এলবিডব্লিউ হন রোহিত। আউটের সিদ্ধান্ত দিতে সময় নেননি আম্পায়ার। রিভিউ নিয়েও উইকেট বাঁচাতে পারেননি বিরাট কোহলির পরিবর্তে ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দেয়া রোহিত শর্মা। দলীয় মাত্র ১০ রানে সাজঘরে ফেরেন তিনি। এরপর তিনে ব্যাটিংয়ে নামা লোকেশ রাহুলকে সঙ্গে নিয়ে দলকে খেলায় ফেরাতে চেষ্টা করেন অন্য ওপেনার শেখর ধাওয়ান। ২০ রানের ব্যবধানে আউট হয়ে ফেরেন রাহুল।

বাংলাদেশ দলের তরুণ লেগ স্পিনার আমিনুল ইসলাম বিপ্লব নিজের প্রথম ওভারে বোলিংয়ে এসেই তুলে নেন রাহুলের উইকেট। তার করা সপ্তম ওভারের তৃতীয় বলে শর্ট কাভারে ফিল্ডিং করা অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের হাতে ক্যাচ তুলে দিয়ে ফেরেন রাহুল। তার বিদায়ে ৬.৩ ওভারে ৩৬ রানে ২ উইকেট হারায় ভারত। এরপর ভারতীয় তরুণ তারকা ব্যাটসম্যান স্রেয়াশ আয়ারকে দ্বিতীয় শিকারে পরিণত করেন বিপ্লব। তার বলে বাউন্ডারি হাঁকাতে গিয়ে অভিষিক্ত মোহাম্মদ নাইমের হাতে ক্যাচ তুলে দিয়ে ফেরেন স্রেয়াশ।

ইনিংসের শুরু থেকে দায়িত্বশীল ব্যাটিং করে যাওয়া শেখর ধাওয়ানকে রান আউটের ফাঁদে ফেরেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক রিয়াদ। তার আগে ৪২ বলে ভারতের হয়ে সর্বোচ্চ ৪১ রান করে ফেরেন শেখর। জাতীয় দলের তরুণ অলরাউন্ডার আফিফ হোসেনের দুর্দান্ত ক্যাচে পরিনত হয়ে সাজঘরে ফেরেন শুভম দুবে। বাংলাদেশ সিরিজে অভিষেক হওয়া ভারতীয় এ তরুণকে ক্যারিয়ারের শুরুর ম্যাচে মাত্র ১ রানে আউট করেন আফিফ।

বাংলাদেশ দলের এ তরুণ অলরাউন্ডারের অফ স্পিনে বিভ্রান্ত হয়ে উইকেটের ওপর ক্যাচ তুলে দেন শুভম। বল ডেলিভারি দেয়ার পরও সামান্য ওপরে ওঠা বলটি দক্ষতার সঙ্গে তালুবন্দি করেন আফিফ। দলীয় ১০২ রানে ভারতীয় পঞ্চম ব্যাটসম্যান হিসেবে সাজঘরে ফেরেন শুভম। ২৬ বলে ২৭ রান করা রিশব প্যান্টকে দ্বিতীয় শিকারে পরিনত করেন শফিউল।

১৮.২ ওভারে ৬ উইকেটে ১২০ রান করা ভারতকে সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে শেষ দিকে ব্যাটিং তাণ্ডব চালান করুনাল পান্ডিয়া-ওয়াশিংটন সুন্দর। তারা শেষ দিকে মাত্র ১০ বল মোকাবেলা করে এক চার ও তিন ছক্কায় ২৮ রান তুলে নেন। তাদের কারণেই ১৪৮ রান তুলতে সক্ষম হয় ভারত। আর বাংলাদেশের পক্ষে ২টি করে উইকেট নিয়েছেন আমিনুল ইসলাম বিপ্লব আর শফিউল ইসলাম। এর ফলে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এটিই ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম জয়। এই জয়ে তিন ম্যাচ সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।

ফল: বাংলাদেশ ৭ উইকেটে জয়ী।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ভারত: ২০ ওভারে ১৪৮/৬ (ধাওয়ান ৪১, রোহিত ৯, রাহুল ১৫, শ্রেয়াস ২২, পান্ত ২৭, দুবে ১, পান্ডিয়া ১৫*, সুন্দর ১৪*; শফিউল ৪-০-৩৬-২, আল আমিন ৪-০-২৭-০, মুস্তাফিজ ২-০-১৫-০, আমিনুল ৩-০-২২-২, সৌম্য ২-০-১৬-০, আফিফ ২-০-১৫-০, মোসাদ্দেক ১-০-৮-০, মাহমুদউল্লাহ ১-০-১০-০)

বাংলাদেশ: ১৯.৩ ওভারে ১৫৪/৩ (লিটন ৭, নাঈম ২৬, সৌম্য ৩৯, মুশফিক ৬০*, মাহমুদউল্লাহ ১৫*; চাহার ৩-০-২৪-১, সুন্দর ৪-০-২৫-০, খলিল ৪-০-৩৭-১, চেহেল ৪-০-২৪-১ , পান্ডিয়া ৪-০-৩২-০, দুবে ০.৩-০-৯-০)।

বাংলাদেশ একাদশ: সৌম্য সরকার, লিটন দাস, নাঈম শেখ, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ, আফিফ হোসেন, মোসাদ্দেক হোসেন, আমিনুল ইসলাম, শফিউল ইসলাম, মুস্তাফিজুর রহমান, আল আমিন হোসেন।

ভারত একাদশ: রোহিত শর্মা (অধিনায়ক), শিখর ধাওয়ান, লোকেশ রাহুল, শ্রেয়াস আইয়ার, রিশাভ পান্ত, শিবম দুবে, ক্রুনাল পান্ডিয়া, ওয়াশিংটন সুন্দর, যুজবেন্দ্র চেহেল, দিপক চাহার, খলিল আহমেদ।