মাতৃতুল্য’ নারীকে কৌশলে পানির সাথে চেতনানাশক ঔষধ খাইয়ে অজ্ঞান করে ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণ করে ব্লাকমেইল করার অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় অভিযুক্ত দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে উপজেলার শ্রীকৃষ্ণপুর (জামবাড়ী) এলাকার মৃত মোশারফ হোসেনের ছেলে ও ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলা পিআইও অফিসের কার্য-সহকারী নুরহুদা।

নিউজ ডেস্ক: ‘মাতৃতুল্য’ নারীকে অভিনব কৌশলে পানির সাথে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে অজ্ঞান করে ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণের পর সেই ভিডিও ও ছবি দিয়ে ব্লাকমেইল করে একাধিকবার ধর্ষণের পর উক্ত ছবি ধর্ষণের শিকার নারীর স্বামীকে পাঠানোর অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলা পিআইও অফিসের কার্য-সহকারী নুরহুদাকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।

শুক্রবার (৮ জানুয়ারি) বিকেলে মেট্রোপলিটন ম্যজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক শাহিনূর রহমান এই আদেশ দেন। এর আগে মেট্রোপলিটন ম্যজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক জসিম উদ্দীন অভিযুক্ত নুরহুদাকে একদিনের রিমান্ডের আদেশ দেন। পরে মামলার তদন্তকারী পিবিআই পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম অভিযুক্ত নুরহুদাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পান। তিনি অভিযুক্ত নুরহুদাকে আরো জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কারাগারে রাখতে আদালতে আবেদন করেন।

এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলা পিআইও অফিস থেকে কার্য-সহকারী নুরহুদাকে গ্রেফতার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ সময় নুরহুদার ব্যবহৃত মোবাইল ও ফুলবাড়ীয়া উপজেলা পিআইও অফিসের সরকারি কাজে ব্যবহৃত কম্পিউটারে মামলায় অভিযোগকৃত আপত্তিকর ছবিসহ তথ্যাদি পাওয়ায় উক্ত মোবাইল ও কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক জব্দ করা হয়।

এর আগে গত বছরের ১৫ অক্টোবর সাইবার টাইব্যুনালে ভুক্তভোগী নারী বাদী হয়ে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের কথিত নারী নেত্রী জেসমিন ও তার মেয়ে জামাতা নুরহুদার বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। অভিযুক্ত প্রধান আসামি নুরহুদা উপজেলার শ্রীকৃষ্ণপুর (জামবাড়ী) এলাকার মৃত মোশারফ হোসেনের ছেলে। সে বর্তমানে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলা পিআইও অফিসে কার্য-সহকারী হিসেবে কর্মরত।

অপর অভিযুক্ত জেসমিন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার বিনোদনগর ইউনিয়নের রামভন্দ্রপুর গ্রামের বেলালের স্ত্রী। তিনি গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ২নং (৪, ৫, ও ৬) ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে নির্বাচন করে হেরে যান। তার স্বামী বেলাল দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলা পিআইও অফিসের কর্মচারী বলে জানা গেছে।

পুলিশ ও আদালতের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ৬ জুলাই দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে উপজেলার বিনোদনগর ইউনিয়নের রামভন্দ্রপুর গ্রামের বেলালের স্ত্রী জেসমিনের এক আত্মীয় তার বাড়িতে বেড়াতে আসেন। পরেরদিন জেসমিনের হবু মেয়ে জামাই নুরহুদার মায়ের অসুস্থতার কথা বলে কবিরাজের কাছে ওষুধ আনতে ওই আত্মীয়কে নুরহুদার সাথে পাঠানো হলে নূরহুদা পথে মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে কথা বলেন। এর একপর্যায়ে ভুক্তভোগী নারী পানির তৃষ্ণার কথা জানালে, নুরহুদা ওই ‘মাতৃতুল্য’ নারীকে একটি পানির বোতল দেন। ভুক্তভোগী নারী সেই বোতলের পানি পান করার কিছুক্ষণের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে যান।

এর পরে ভুক্তভোগী নারীর জ্ঞান ফিরলে তিনি দেখেন একটি টিনশেড ঘরের খাটের মধ্যে শুয়ে আছেন। তবে তার শরীরে কোন কাপড় নাই। আর অভিযুক্ত নুরহুদা পাশে থেকে মোবাইলে ওই ‘মাতৃতুল্য’ নারীর উলঙ্গ শরীরের ছবি তুলছেন। তখন তিনি চিৎকার করলে নুরহুদা ভুক্তভোগী নারীর মুখ চেপে ধরেন। এ সময় এই ঘটনা কাউকে বললে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেন নুরহুদা। এছাড়া নির্যাতনের শিকার নারীকে নুরহুদার তোলা বেশ কিছু ছবি ও ভিডিও দেখান, আর বলেন, নুরহুদার কথা না শুনলে ছবিগুলো তার (মাতৃতুল্য) নারীর স্বামীকে দেওয়া হবে এবং ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়া হবে।

পরে ভুক্তভোগী নারী বাসায় ফিরে তার আত্মীয় কথিত নারী নেত্রী জেসমিনকে তার হবু মেয়ে জামাই কর্তৃক ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণ করে রাখার কথা জানালে উল্টো নির্যাতনের শিকার নারীকে বকাঝকা করেন জেসমিন। এছাড়া ধর্ষণের শিকার নারীর সংসার ভেঙ্গে দেয়ার ভয় দেখিয়ে চুপ থাকতে বলেন। নয় তো ভুক্তভোগী নারীর ছেলেকে পুকুরে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলার হুমকিও দেন তিনি।

এর পর ২০১৮ সালের ১০ আগস্ট ভুক্তভোগী নারীর ছেলেকে জিম্মি করে নুরহুদার সাথে দেখা করতে বাধ্য করা হয়। এছাড়া ছবি মুছে দেয়ার কথা বলে নবাবগঞ্জের কৃষ্ণজীবনপুর গ্রামের তারা মিয়ার স্ত্রী জোসনা ওরফে রিতির বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে রিতিকে ভাবী বলে পরিচয় করিয়ে দেন নুরহুদা।

এ সময় নুরহুদা টয়লেটে গেলে ভুক্তভোগী নারী রিতির পা ধরে বলেন, নুরহুদা তাকে ব্লাকমেইল করেছে। তাকে বাঁচানোর অনুরোধ করেন তিনি। কিন্তু রিতি তাকে ঘরে রেখে বাহিরে থেকে দরজা লাগিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পরে নুরহুদা ঘরে প্রবেশ করে রিতির সহযোগিতায় মাতৃতুল্য নারীকে মারধর ও কাপড়-চোপড় ছিড়ে আবারো জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন।

এর পরেও নুরহুদার সাথে দেখা না করলে উক্ত নারীর স্বামীকে উল্টাপাল্টা বলে তার সংসার ভেঙ্গে দেওয়া বলে হুমকি দেয়া হয়। একই সাথে ভুক্তভোগী নারীর ছেলেকে পুকুরের পানিতে ফেলে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। এভাবে ভুক্তভোগীর স্বামীকে ছবি ও ভিডিও দিয়ে দেয়াসহ ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ও ছেলে জিম্মি করে জেসমিন ও রিতির সহযোগিতায় আরো কয়েকবার ‘মাতৃতূল্য’ ওই নারীকে ধর্ষণ করেন নুরহুদা।

এর মধ্যে ২০১৯ সালের ১০ মার্চ ভুক্তভোগীর ছেলেকে জিম্মি করে নবাবগঞ্জের পার্শ্ববর্তী পীরগঞ্জের আনন্দনগর পার্কে নিয়ে যান জেসমিন ও নুরহুদা। সেখানে গিয়েও তার মেয়ে জামাই নুরহুদা ‘মাতৃতূল্য’ ওই নারীকে ধর্ষণ করেন। এ সময় ভুক্তভোগী নারীকে মারধরও করা হয়।

এরপর ভুক্তভোগী নারী তার স্বামীর কাছে চলে গেলে ২০১৯ সালের ১০ মে সেখানে গিয়েও লম্পট নুরহুদা ও তার বন্ধু দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার নয়ানী রাঘবেন্দ্রপুর গ্রামের সৈয়দ আলীর ছেলে মোকারম হোসেনের সহযোগিতায় ভুক্তভোগীর নারীর ছেলেকে জিম্মি করে ধর্ষণ করেন। এর পরেও নুরহুদার সাথে দেখা না করায় ‘মাতৃতুল্য সেই নারী’র স্বামীকে ফোন করে ভুক্তভোগী নারীর সংসার ভেঙ্গে দিতে উৎসাহ প্রদান করেন অভিযুক্ত নুরহুদা।

এক পর্যায়ে ভুক্তভোগী নারীর স্বামীকে বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে অশ্লীল ছবি দেন নুরহুদা। এর মধ্যে বেশ কিছু কলরেকর্ডও দেয় নূরহুদা। বিষয়টি আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে জানাজানি হলে অভিযুক্ত জেসমিন ও তার স্বামী বেলাল, নুরহুদার বড় ভগ্নিপতি, মামাত ভাই সোহেল ও বেলালের ভাতিজা আমিনুরসহ বেশ কয়েকজন ওই নারীর বাসায় গিয়ে আইনের আশ্রয় নিতে বাধা প্রদান করেন। আইনের আশ্রয় নিলে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়াসহ প্রাণনাশের হুমকি দেন।

এ সময় ভুক্তভোগীর নারীর পিতা ও ভাইকে টাকা-পয়সা দিয়ে ধর্ষণ ও ব্লাকমেইল করার বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। এছাড়া কূৎসা রটানোসহ অনবরত হুমকি-ধামকিতে ভীত ভুক্তভোগী আইনের আশ্রয় নিতে পারছিলেন না। পরে পুলিশের পরামর্শে ভুক্তভোগী নারী গত ১৫ অক্টোবর সাইবার টাইব্যুনালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন। পরে আর্জি ও প্রয়োজনীয় প্রমাণাদি পর্যালোচনা করে বিজ্ঞ আদালত বিষয়টি ডিএমপির মোহাম্মদপুর থানাকে এজাহার হিসেবে গ্রহণ করতে ও পিবিআইকে বিষয়টির তদন্তের নির্দেশ দেন।

এদিকে সরেজমিনে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলা পরিষদ এলাকা, শ্রীকৃষ্ণপুর (জামবাড়ী) রামভদ্রপুর ও কৃষ্ণজীবনপুরসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কথিত নারী নেত্রী জেসমিন নবাবগঞ্জের মূর্তিমান আতঙ্ক ও বহু অপকর্মের হোতা। তিনি ঢাকার আলোচিত নারী নেত্রী পাপিয়ার মতো উপজেলা প্রশাসনের কর্মচারীসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের নারী সাপ্লাই দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। আর এই কাজে বিভিন্ন নারীকে ফাঁদে ফেলেন বলেও একাধিক ভুক্তভোগী নারী সূত্রে জানা গেছে।

এছাড়া এক শ্রেণির কর্মচারীর সহযোগিতায় উপজেলা পরিষদের পিআইও অফিসের ত্রাণ সামগ্রী চুরি করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন নবাবগঞ্জের পাপিয়া খ্যাত জেসমিন। বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সবাই জানলেও জেসমিন বাহিনীর ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। তার নেতৃত্বে রয়েছে একটি বিশেষ বাহিনী। তবে জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপার ও দুদকসহ বিভিন্ন দপ্তরে এই সকল বিষয়ে বিভিন্ন অভিযোগ জমা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

অপর একটি সূত্র জানা গেছে, কথিত নারী নেত্রী জেসমিন ও নুরহুদার রয়েছে সুদের ব্যবসা। তাদের কাছ থেকে সুদে টাকা হাওলাত নিয়ে এলাকা ছাড়া হয়েছেন বেশ কয়েকজন ব্যক্তি। এর মধ্যে তাদের আত্মীয়কে পর্যন্ত ছাড় দেয়নি সুদ ব্যবসায়ী জেসমিন বাহিনী।

এদিকে নুরহুদা একাধিক মেয়েকে বিয়ের প্রলোভন ও প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে নয়ানী রাঘবেন্দ্রপুর গ্রামের এক ছাত্রীও রয়েছে। সাধারণত নুরহুদা ভুক্তভোগী নারীদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেন। পরে তাদের কল রেকর্ড ও গোপনে অন্তরঙ্গ মূহূর্তের তোলা ছবি-ভিডিও দিয়ে ব্লাকমেইল করেন। এভাবে নুরহুদার ফাঁদে পড়ে অনেক গৃহবধূর সংসার ভাঙ্গনের মুখে রয়েছে বলে ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া এ সংক্রান্ত বেশ কিছু প্রমাণ এই প্রতিবেদকের কাছে এসেছে।