নিউজ ডেস্ক: একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সাহসী গেরিলা যোদ্ধার পুরো নাম শাফী ইমাম রুমি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের অসংখ্য দেশপ্রেমী তরুণ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নিজের জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে তরুণ গেরিলা যোদ্ধারা বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি সেনাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালাতো।

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিকামী তরুণ গেরিলা দলের হাতে বহুসংখ্যক পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। সাহসী এই গেরিলা যোদ্ধাদের দলটির নাম দেওয়া হয় ‘ক্র্যাক প্লাটুন’। এই ক্র্যাক প্লাটুনের একজন দৃঢ়চেতা যোদ্ধা ছিলেন শহীদ শাফী ইমাম রুমি।

শাফী ইমাম রুমী বীর বিক্রম ১৯৫১ সালের ২৯ মার্চ শরীফুল আলম ইমাম আহমেদ এবং জাহানারা ইমামের উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আই.এস.সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর ১৯৭১‌ সালের মার্চ মাসে রুমী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন। এছাড়া বিশেষ অনুমতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর অর্থনীতি বিভাগ এ ক্লাস করতেন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র এবং তুখোড় বিতার্কিক। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে পড়ার সুযোগ পেলেও যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় আদর্শগত কারণে দেশকে যুদ্ধের মধ্যে রেখে বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে যাননি।

যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে, রুমী ধারাবাহিকভাবে তার মা ও বাবাকে নিজের যুদ্ধে যাবার ব্যাপারে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। ১৯৭১ সালের ১৯ এপ্রিল মাকে অবশেষে রাজি করিয়ে সীমান্ত অতিক্রমের সুযোগ খুজছিলেন। পরে ২ মে রুমী সীমান্ত অতিক্রমের প্রথম প্রয়াস চালান। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তাকে ফেরত আসতে হয় এবং দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় সফল হন।

তিনি সেক্টর-২ এর অধীনে মেলাঘরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই সেক্টরটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন খালেদ মোশাররফ ও রশিদ হায়দার। প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি ঢাকায় ফেরত আসেন এবং ক্র্যাক প্লাটুনে যোগ দেন। ক্র্যাক প্লাটুন হল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা আক্রমণ পরিচালনাকারী একটি সংগঠন।

রুমী ও তার দলের ঢাকায় আসার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন হামলা করা। এ সময় তাকে ঝুঁকিপূর্ণ আক্রমণ পরিচালনা করতে হয় যার মধ্যে ধানমণ্ডি রোডের একটি আক্রমণ ছিল উল্লেখযোগ্য। সেখানে একটি পাকিস্তানী সেনা জিপ তাদের বহনকারী গাড়ির পিছু নিলে তিনি গাড়ির পেছনের কাচ ভেংগে ‘দেখো দেখো, একটি জিপ আমাদের অনুসরণ করছে’ বলে স্টেনগান ব্রাশফায়ার করেন। তার গুলিতে পাকিস্তানি জিপের ড্রাইভার নিহত হয় এবং গাড়ি ল্যাম্পপোস্টে যেয়ে ধাক্কা খায়। বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা তার গুলিতে মারা যায়। ধানমণ্ডি রোডের অপারেশনের পর রুমী তার সহকর্মীদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট তিনি তাঁর নিজের বাড়িতে কাটান, এবং এই রাতেই বেশকিছু গেরিলা যোদ্ধার সাথে তিনি পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী একটি অজ্ঞাত উৎস থেকে তথ্য নিয়ে বেশ কিছুসংখ্যক যোদ্ধাকে গ্রেফতার করেন যার মধ্যে ছিলেন আলতাফ মাহমুদ, আবুল বারাক, আজাদ ও জুয়েল। রুমীর সাথে তার বাবা শরীফ এবং ভাই জামীকেও ধরে নিয়ে যায়।

জিজ্ঞাসাবাদের স্থানে রুমীকে ভাই ও বাবাসহ একঘরে আনলে রুমী সবাইকে তার যুদ্ধে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করতে বলেন। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন যে, পাক বাহিনী তার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন এবং এর সব দায়-দায়িত্ব তিনি নিজেই নিতে চান। ৩০ আগস্টের পর রুমী ও তার সহযোদ্ধা বদী এবং চুল্লুকে আর দেখা যায়নি।

ইয়াহিয়া খান ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিলে অনেক আত্মীয় তার জন্য আবেদন করতে বলেন। কিন্তু রুমী যে বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ধরা পড়েছে, তাদের কাছেই ক্ষমা চাইতে রুমীর বাবা মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী, দেশপ্রেমিক শরীফ ইমাম রাজি ছিলেন না।

রুমিদের মতো অসংখ্য তরুণের আত্মদানের মাধ্যমেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। স্বাধীনতার পর রুমির মা জাহানারা ইমাম ‘শহীদ জননী’ নামে খ্যাত হন।

২০১৩ সালের ১৭ই জুলাই, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ-এর বিরুদ্ধে গণহত্যা, বুদ্ধিজীবি হত্যার পরিকল্পনা, রুমী হত্যা ও নির্যাতন ইত্যাদিসহ মোট উত্থাপিত ৭টি অভিযোগের মধ্যে ৫টিতে দোষী প্রমাণিত হয়। এর মাঝে দুটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়।