নিজস্ব প্রতিবেদক: সিংড়ার কথিত প্রকৌশলী সোহান মাহমুদ ওরফে শুভ মৃধার প্রেমের ফাঁদে পড়ে বিয়ে বসেছেন রাজশাহীর বাসিন্দা ও সিরাজগঞ্জের একটি প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের এক ছাত্রী। এমনকি প্রতারণার অভিযোগে একদিনের মাথায় স্বামীকে তালাকও দিয়েছেন তিনি।

প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত সোহান মাহমুদ ওরফে শুভ মৃধা এলাকায় ফারুক নামে পরিচিত। তিনি সিংড়া উপজেলার বাকুন্দা এলাকার আবদুল মজিদ মৃধার ছেলে। আর ভুক্তভোগী ছাত্রীর পিতা একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী, তিনি রাজশাহী মহানগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকার বাসিন্দা।

জানা গেছে, গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী মহানগরীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে মহাধুমধামে তাদের বিয়ে হয়। তবে এটি শুভ মৃধার তৃতীয় বিয়ে। এর আগে প্রথম বিয়ের কথা গোপন করে এক কলেজ ছাত্রীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিয়ে করেন শুভ। আগের দুই স্ত্রীর দুটি সন্তানও রয়েছে।

এদিকে স্বামীর তৃতীয় বিয়ের খবরে ওই দিনই সন্তানসহ দ্বিতীয় স্ত্রী রাজশাহী এলে জানাজানি হয় শুভর প্রতারণা। পরদিনই শুভকে তালাক দেন ওই মেডিকেল ছাত্রী। প্রতারিত হয়ে সেদিনই তার বাবা নগরীর রাজপাড়া থানায় সাধারণ ডায়েরী করেছেন।

প্রতারিত মেডিকেল ছাত্রীর বাবার ভাষ্য, মেয়েটাকে শুভ প্রেমের ফাঁদে ফেলেছিল। মেয়েটা বড় হয়েছে বলে তার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলাম। শুভ বলেছিল, তার বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল। তবে সম্পর্ক নেই। ঠিকানা দেয়া হয়েছিল নাটোর সদরের। ভেবেছিলাম মেয়ে ডাক্তার হচ্ছে, ছেলে ইঞ্জিনিয়ার, তারা ভালো থাকবে। কিন্তু সবই মিথ্যা। ও একটা বড় প্রতারক।

শুভর বাবা আবদুল মজিদ মৃধার দাবি, সবগুলো বিয়ে শুভ একা একা করেছে। আর তৃতীয় বিয়ের কথা তিনি জানতেন না। তবে তার ছেলে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু তিনি অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল নন, তিনি একজন সাধারণ কৃষক।

সিংড়ার ইটালী ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মকবুল হোসেন জানিয়েছেন, শুভ মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে পারেননি। শুভ মৃধার ডাক নাম ফারুক। তার বাবা একজন ভূমিহীন কৃষক। মাধ্যমিক পাশ করতে না পারলেও তিনি অন্যের সনদ দিয়ে চাকরি করছে বলে শুনেছেন বলে জানান তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিংড়া উপজেলা সদরে জীবিকার তাগিদে মোবাইলে রিচার্জের ব্যবসা করতেন শুভ। কিছু দিন গাড়িচালক হিসেবেও কাজ করেন। এরপর প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় দিয়ে শিক্ষা সনদের জাল ফটোকপি দিয়ে চাকরি নেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

শিক্ষাবোর্ড এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে, শুভ চাকরি নেয়ার সময় শিক্ষা সনদের যেসব ফটোকপি দিয়েছেন, তার সবই জাল। শুভর ভোটার তথ্য ফরমে (ভোটার নম্বর- ৬৯০৮২০০৩৩) দেয়া হয়েছে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিক। তবে তিনি মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হননি। অথচ শুভ রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজিতে ডিপ্লোমা এবং ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্স (ইউআইটিএস) থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে বিএসসি পাশের জাল সনদ দিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছেন।

শুভর এসএসসির রোল নম্বর দিয়ে অনলাইনে শিক্ষাবোর্ডের আর্কাইভে কোনো শিক্ষার্থীরই ফলাফল পাওয়া যায়নি। শুভ যেসব সনদ ব্যবহার করেছেন তার মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসির রোল নম্বর ১০৮৩১২। পাসের বছর ২০০৪ সাল।

রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর আনোয়ারুল হক প্রামানিক বলেন, অনলাইন আর্কাইভে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ফলাফল দেয়া আছে। সেখানে ফলাফল না পাওয়া গেলে বুঝতে হবে সনদপত্রটি জাল।

বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের অনলাইনেও শুভর সনদের রোল নম্বর দিয়ে ফলাফল পাওয়া যায়নি। ডিপ্লোমার সনদ বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের রোল নম্বর ৫১০৩১৩। পাসের বছর ২০০৮।

বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. প্রকৌশলী সুশীল কুমার পালও বলেছেন, শুভর ওই সনদটি জাল।

আর ইউআইটিএসের যে সনদ দেয়া হয় তার সিরিয়াল নম্বর ৩০৫২২২। ২০১৩ সালের আগস্টে ইস্যু হিসেবে দেখানো এই সনদে শিক্ষার্থীর আইডি নম্বর- ১০৪২০২৭১। শিক্ষার্থীর আইডি নম্বর নিয়ে খুঁজে দেখে এই সনদও জাল বলে নিশ্চিত করেন ইউআইটিএআইয়ের সিনিয়র সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জেসমিন সুলতানা।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরো ভয়ংকর তথ্য, শুভ ২০০৯ সালে সিংড়া পৌরসভার মাদারিপুর মহল্লার এক ভ্যান চালকের মেয়েকে বিয়ে করেন। শ্বশুরবাড়ি যাওয়া-আসার সময় ২০১৪ সালে একই এলাকার এক ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রীর মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে কথাবার্তা শুরু করেন। তবে গোপন রাখেন বিয়ের কথা।আর শুভ তখন একজন প্রকৌশলী হিসেবেই কুষ্টিয়ায় একটা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

২০১৪ সালে ১২ নভেম্বর শুভ প্রেমের ফাঁদে ফেলে সেই ছাত্রীকে আদালতে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করেন। এরপর আগের বিয়ের কথা জানিয়ে সেদিনই প্রথম স্ত্রীকে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তালাক দেন। শুভর তালাকপ্রাপ্ত প্রথম স্ত্রীর এখন পাঁচ বছরের একটা ছেলেও আছে।

এদিকে দ্বিতীয় স্ত্রী জানান, গত বছর শুভ ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। বেতন পেতেন প্রায় ৫০ হাজার টাকা। তখন তিনি স্বামীর সঙ্গেই ঢাকায় থাকতেন। গত বছরের নভেম্বরে শুভ সেই চাকরি ছেড়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের একটি প্রকল্পে প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। এরপর শুভ রাজশাহীতে থাকতে শুরু করেন। তিনি রাজশাহী আসতে চাইলেও শুভ তাকে বলতেন, কিছু দিন পরই এই চাকরি ছেড়ে তিনি ঢাকায় আসবেন। এভাবে তাকে রাজশাহী না এনে তৃতীয় বিয়ের ফাঁদ পাতেন।

তিনি আরো জানান, তৃতীয় বিয়ের পরদিনই শুভ তালাকপ্রাপ্ত হলে নিজের সন্তানের কথা ভেবে তিনি মেনে নেন। রাজশাহী থেকে স্বামীকে বাড়ি নিয়ে যান। সাতদিন শুভ শ্বশুরবাড়িতেই থাকেন। এরপর ব্যাংক ঋণের কথা বলে শুভ তার অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য শ্বশুরের কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। ড্রয়ার থেকে নেন আরও ৯৫ হাজার টাকা। সঙ্গে একজোড়া বালা নিয়ে ব্যাংকে ঋণ পরিশোধের কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। এরপর থেকে সে আর যোগাযোগ করছেন না।

এদিকে মোবাইলে সোহান মাহমুদ ওরফে শুভ মৃধা ওরফে ফারুক নিজের শিক্ষা সনদ আসল বলে দাবি করলেও প্রতারণা করে বিয়ের বিষয়ে বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘তিনটা বিয়ে করেছি, সবগুলোই অ্যাকসিডেন্ট।’ শিক্ষা সনদ জালিয়াতি করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সবাই কেন সার্টিফিকেট জাল বলছে তা বুঝতে পারছি না। আমি পাঁচ-ছয় মিনিট পর আপনাকে ফোন করছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘সার্টিফিকেট জাল করি আর যাই করি, যেখান থেকে পারি সেখান থেকে আয় করে স্ত্রীকে খাইয়েছি। এখন আমার তৃতীয় বিয়েকে কেন্দ্র করে এসব কথা বাইরে বলে বেড়াচ্ছে।’

এব্যাপারে রাজশাহী নগরীর রাজপাড়া থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে শুভর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।